kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জাতিসংঘে পাল্টাপাল্টি ভারত-পাকিস্তান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জাতিসংঘে পাল্টাপাল্টি ভারত-পাকিস্তান

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গত বুধবার দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দুই দেশের শান্তি আলোচনায় ভারতকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ভারত ‘নজিরবিহীন’ভাবে অস্ত্র সমাবেশ ঘটাচ্ছে।

এ প্রচেষ্টা রুখতে যা করা দরকার পাকিস্তান তা করবে। কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অগ্রাহ্য করছে। পরে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের কাছে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণপত্র হস্তান্তর করেন।

নওয়াজ শরিফের এই ভাষণের জবাব দিতে অধিবেশনে ভারতের পক্ষে বক্তব্য দেন কূটনীতিক ইনাম গম্ভীর। তিনি নওয়াজের বক্তব্যকে ‘দীর্ঘ ভাষণ’ বলে কটাক্ষ করে পাকিস্তানের ওপর এক হাত নেন। তিনি পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র এবং সন্ত্রাসী চক্রের উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

নওয়াজের ভাষণের জবাব দিতে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘রাইট  অব রিপ্লাই-এ দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইনাম গম্ভীর। তিনি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘মিথ্যায় ভরপুর’ বলে উল্লেখ করেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

ইনাম গম্ভীর বলেন, ‘পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘস্থায়ী নীতির কারণে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রাস্তায় চলাফেরা করে।

গম্ভীর বলেন, ‘মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনই সন্ত্রাস। যখন তা রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা যুদ্ধাপরাধ। আমরা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আজ যা মোকাবিলা করছে, তা হলো পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের লালিত সন্ত্রাসবাদ। আমাদের অঞ্চলে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই সন্ত্রাসবাদ। ’

পাকিস্তানকে দেওয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়েও দেশটিকে আক্রমণ করেন গম্ভীর। তিনি বলেন, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ সহযোগিতা নেয় পাকিস্তান। যার একটি বড় অংশ সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও সমর্থনে ব্যয় করা হয়, যা ভারত-আফগানিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি প্রক্সি’ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বলতে গিয়ে হিজবুল মুজাহিদীনের বুরহান ওয়ানির নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে গম্ভীর বলেন, এখনো পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী একজন সন্ত্রাসীদের পক্ষে কথা বলছেন।

ভারতশাসিত কাশ্মীরে গত রবিবার সেনাঘাঁটিতে হামলায় নিহত হন ১৯ ভারতীয় সেনা। ভারতের দাবি, পাকিস্তান থেকে এসে হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এ নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মহল ও দক্ষিণ এশিয়ায় একঘরে করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। জাতিসংঘে পাকিস্তানকে তুলাধোনা করার কারণই হলো তাদের আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

নওয়াজের ভাষণ, অস্ত্র মজুদ নিয়ে হুঁশিয়ারি : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বুধবার দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ভারতের ‘নজিরবিহীন’ অস্ত্র সমাবেশ পাকিস্তান সহ্য করবে না। তিনি বলেন, ভারতের এ তৎপরতা রুখতে যা করা দরকার, পাকিস্তান তা-ই করবে। গত রবিবার কাশ্মীরের উরিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর ভারতের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার মুখে এ ভাষণ দেন নওয়াজ শরিফ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার বিপদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এড়িয়ে যাচ্ছে, এর পরিণাম তাদের ভোগ করতে হবে। ’ নওয়াজ বলেন, ‘পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে শান্তি চায়। এই শান্তি অর্জনে আমি অনেক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু সংলাপে বসতে ভারতের পূর্বশর্ত অগ্রহণযোগ্য। ’

নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, কেবল পাকিস্তানের স্বার্থেই আলোচনার গুরুত্ব রয়েছে তা নয়, এটি দুই দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। আমাদের মতপার্থক্যগুলো নিরসনে এটা অপরিহার্য। ’ তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শনের সব পন্থা নিয়ে আলোচনা করতে আমরা তৈরি আছি। আলোচনা যেকোনো ফোরামে কোনো রকম শর্ত ছাড়াই করতে আমরা প্রস্তুত। ’ নওয়াজ তাঁর ভাষণে কাশ্মীরি জনগণের ওপর ভারতীয় বাহিনীর পরিচালিত নির্যাতনের ঘটনাগুলো তদন্ত করার জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পুনরায় আহ্বান জানান।

নওয়াজের ভাষণের আরো প্রতিক্রিয়া : নওয়াজের ভাষণের পর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভারতের পক্ষে কূটনীতিক ইনাম গম্ভীর কড়া জবাব দেন। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর তীব্র প্রতিক্রয়া ব্যক্ত করেন। তিনি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে একটি স্বাধীন জাতির নেতা (নওয়াজ) একজন আত্মস্বীকৃত জঙ্গিকে (বোরহান) মহিমান্বিত করেছেন। এর মাধ্যমে পাকিস্তান নিজেকেই দোষারোপ করল।

এ ছাড়া নওয়াজের ভাষণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই টুইটারে তাঁর কঠোর সমালোচনা করেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ। তিনি টুইটারে লেখেন, বুরহান ওয়ানিকে মহিমান্বিত করে নওয়াজ শরিফ সন্ত্রাসের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কটা বুঝিয়ে দিলেন। ’

আরেকটি টুইটে বিকাশ স্বরূপ বলেন, পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে উরিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা পুরোপুরি চেপে গেছেন।

নওয়াজের আহ্বান ‘প্রত্যাখ্যান’ মুনের : জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ কাশ্মীর ইস্যু এবং ভারত-পাকিস্তান সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চান। এ ছাড়া তিনি বুধবার অধিবেশনের শেষদিকে কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর পরিচালিত বর্বরতার কিছু দলিল জাতিসংঘ মহাসচিবের হাতে পৌঁছে দেন। জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী মিশনের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।

পরে জাতিসংঘ মহাসচিব এক বিবৃতিতে কাশ্মীর ইস্যুসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ভারত ও পাকিস্তানকে সংলাপে বসার আহ্বান জানান। তবে নওয়াজের করা অভিযোগের ব্যাপারে কিছু বলেননি। এর আগে সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণেও বান কি মুন তাঁর ভাষণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কথা বললেও কাশ্মীর ইস্যুটি উচ্চারণই করেননি। তিনি তাঁর ভাষণে জাতিসংঘের এজেন্ডা হিসেবে মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া উপদ্বীপ, মধ্যপ্রাচ্য, ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বললেও একবারও কাশ্মীরের বিষয় উল্লেখ করেননি। সূত্র : এএফপি, রয়টার্স, দ্য হিন্দু, পিটিআই।


মন্তব্য