kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কিশোরদের হিংস্রতা বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিত চাহিদার কারণে

শরীফুল আলম সুমন   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কিশোরদের হিংস্রতা বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিত চাহিদার কারণে

ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ ফারদিন হুদা মুগ্ধের দেওয়া আগুনে ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত বুধবার জীবনপ্রদীপ নিভে যায় হতভাগ্য বাবা রফিকুল হুদার। ফরিদপুর শহরের নামি এই পরিবার যথেষ্ট বিত্তশালী।

ছেলে কিছু চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা চলে আসত। কিন্তু কখন যে ছেলে বখে গেছে তা বুঝতে পারেননি বাবা। যখন বুঝলেন তখন আর কিছুই করার ছিল না তাঁর। একটি থাকার পরও আরো একটি নতুন মডেলের মোটরসাইকেলের দাবি ছিল ছেলের। কিন্তু তা না দেওয়ায় প্রাণ গেল বাবার। মাত্র ১৫ বছরের এই শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত ছিল বলেও জানা যায়।

গত শনিবার চট্টগ্রামে এইচএসসি শিক্ষার্থী সুমিত চৌধুরীর হাতে নিহত হন মা কুমকুম চৌধুরী। চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করে সুমিত। এ জন্য বড় ভাই তাকে বকাঝকা করেন। এটাই এ হত্যাকাণ্ডের কারণ বলে ধারণা করা হয়।

২০১৩ সালে বাবা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে অচেতন করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে মেয়ে ঐশী রহমান। এই পরিবারও ছিল বিত্তশালী। মেয়ের সব ইচ্ছাই নিমিষেই পূরণ করতেন বাবা। এতে ইয়াবা সেবনসহ উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন শুরু করে সে। যখন বাবা বিষয়টি বুঝতে পারেন তখনই মেয়ের হাতে খুন হতে হয় তাঁকে।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, মূলত অনিয়ন্ত্রিত চাহিদার কারণেই কিশোর বয়সীরা হিংস্র হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে হিংস্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সন্তানরা মা-বাবাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করছে না। বিশেষ করে পারিবারিক পরিবেশ যদি খারাপ হয়, পরিবারে মারামারি-হানাহানি, ডিভোর্সের মতো ঘটনা থাকে, তাহলে সেই পরিবারের বাচ্চারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আর যারা মাদকাসক্ত তারাও ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিতে লিপ্ত হয়। নিষ্ঠুর, নির্মম হয়ে ওঠে তারা। সাধারণ তুচ্ছ ঘটনায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, পড়ালেখার বাইরে অন্য কোনো জগৎ না থাকায় কিশোররা বিপথে যাচ্ছে। এখন শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ তেমন একটা নেই। অভিভাবকদের কাছ থেকেও অনেক সময় তারা বন্ধুসুলভ আচরণ পায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এখন নৈতিক শিক্ষার বড় অভাব। ফলে বিপথে যাচ্ছে কিশোররা।

স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় একগাদা বই থাকলেও নৈতিকতা শিক্ষায় তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। স্কুলপর্যায়ে ধর্ম ও নৈতিকতা বিষয়টি আবশ্যিক থাকলেও সেটি একজন শিক্ষার্থীর আচরণ গঠনে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। কারণ শিক্ষার্থীরা এটাকে বিষয় হিসেবে নিয়েছে। তারা মুখস্থ করছে বিষয়টিতে ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য। শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার দীক্ষা দেন না।

মনোবিদ ডা. মোহিত কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার চেম্বারে এমন মা-বাবা নিয়মিতই আসেন, যাঁদের বাচ্চারা চাহিদা পূরণ না করলে ভাঙচুর করে। মোটরসাইকেলের জন্য বাবাকে পুড়িয়ে মারার ঘটনাও ঘটল। আসলে কিছু সন্তানের চাহিদা এখন হিমালয়সম। তারা শিশুকাল থেকে যা চায়, তাই পায়। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুদের যৌক্তিক চাহিদা পূরণ করতে হবে, অযৌক্তিক চাহিদা বাদ দিতে হবে। পরিবারের মধ্যে মা-বাবাকেই ডেমোক্রেটিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে। তবে সন্তানদের নিষ্ঠুরতার পেছনে মাদক একটা বড় কারণ। এ জন্য অভিভাবকদের আগে থেকেই সচেতন হতে হবে। সন্তানদের সময় দিতে হবে। সন্তান যেন পরিবার, বন্ধু, খেলার সাথী, স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। ’

পড়ালেখার বাইরে অন্য কোনো জগৎ না থাকায় শিশু-কিশোররা আসক্ত হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। তারা এখন দিনের বেশির ভাগ সময় কাটায় মোবাইল ফোন, ট্যাব ও কম্পিউটার নিয়ে। কিশোর বয়স অথচ ইন্টারনেট ব্যবহার করে না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ সুযোগ নিয়ে কিশোরদের বেশির ভাগই বিপথে যাচ্ছে। অনেকেই আসক্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতে।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সমাজে সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা, অস্থিরতা বিরাজ করছে। সামাজিকীকরণের যে প্রক্রিয়া থাকা উচিত তাতে ঘাটতি আছে। যে হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেভাবে মূল্যবোধের পরিবর্তন হচ্ছে না। মানবিক বিকাশের জন্য যে জায়গাটা দরকার, তা নেই। একজন শিক্ষার্থীকে কোনো না কোনো চর্চার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু তারা সেটা না করে হয়ে গেছে ক্যারিয়ার বেইজড। মানুষ আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। আগে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস ছিল। সেটা বন্ধ হওয়ায় সেই জায়গায় অন্য কিছু চলে আসছে। কোমল মনোবৃত্তির বদলে শিক্ষার্থীরা রূঢ় হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই বিপথে যাচ্ছে। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা পারভীন বলেন, ‘মেয়েদের ৯, আর ছেলেদের ১১ বছর থেকে মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়। এর পরবর্তী কয়েক বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি কোনো কিছু চায়, তা না দিতে চাইলে অন্যভাবে ঘুরিয়ে বলতে হবে। আর শিশুকে শুরু থেকেই মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। এখনকার শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে অনেক বেশি পরিচয়ের সুযোগ পায়। তাই মা-বাবাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে মায়েদের দায়িত্ব আরো বেশি। অপ্রত্যাশিত কোনো বিষয় শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে ফল ভালো হয় না। ’


মন্তব্য