kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অন্বেষা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ

স্বাধীনতাবিরোধী মোনেম খান ‘শহীদ’!

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দমন-পীড়নে যুক্ত থাকা কট্টর পাকিস্তানপন্থী ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর কুখ্যাত আবদুল মোনেম খানকে ‘শহীদ’ বলে প্রচার চালিয়ে ইতিহাস বিকৃতি করছে ময়মনসিংহের অন্বেষা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। মোনেম খানের মেয়ে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়ামের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার শিক্ষার্থীদের দেওয়া সার্টিফিকেট, নম্বরপত্র ও দাপ্তরিক সব নোটিশে বছরের পর বছর ধরে এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশে যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এহেন অপকর্মের বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ব্রিটিশ কাউন্সিল অনুমোদিত এ প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান জেলা শহরের নতুন বাজার এলাকায় ১৬ সাহেব আলী রোডের একটি বাড়িতে। স্বাধীনতার আগে থেকেই বাড়িটি মোনেম খানের। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তিনি নিহত হওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরিরা

বাড়িটির দেখভাল শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে তাঁর মেয়ে নাসরীন মোনেম খান এখানেই গড়ে তোলেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটি। এর অধ্যক্ষও নাসরীন।

জানা গেছে, প্লে গ্রুপ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানো হয়। এর শিক্ষার্থী প্রায় তিন শর মতো। প্লে গ্রুপে একজন শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি ১০ হাজার টাকা ও মাসিক বেতন দেড় হাজার টাকা। দশম শ্রেণিতে মাসিক বেতন পাঁচ হাজার টাকা ও ভর্তি ফি ১৫ হাজার টাকা। অধ্যক্ষ নাসরীন মোনেম খান মূলত ঢাকায়ই অবস্থান করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম দেখভাল করেন উপাধ্যক্ষ নীলুফার সুলতানা।

স্কুলটি প্রতিষ্ঠার সময় এর সাইনবোর্ডে মোনেম খানকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করায় স্থানীয় ছাত্র-জনতা সেই সাইনবোর্ড ভাঙচুর করেছিল। এরপর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটক সরিয়ে উল্টো দিকে নেয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে মূল ফটকে প্রতিষ্ঠানের কোনো সাইনবোর্ড নেই।

তবে প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষার্থীদের সব নম্বরপত্র, সার্টিফিকেট, দাপ্তরিক কাগজপত্র, চিঠির প্যাড ইত্যাদিতে মোনেম খানকে ‘শহীদ গভর্নর’ বলে উল্লেখ করে চলেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের নামের নিচেই লেখা রয়েছে, ‘ডেডিকেটেড টু দি মেমোরি অব শহীদ গভর্নর আবদুল মোনেম খান’। এসব সার্টিফিকেট, নম্বরপত্র ছেলেমেয়েদের বাসায় পাঠানো হচ্ছে। এতে নতুন প্রজন্মের কাছে কুখ্যাত মোনেম খানের আসল পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। খুবই সুকৌশলে মোনেম খানকে ছেলেমেয়েদের কাছে দেশপ্রেমিক হিরো বানানোর চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারঘোষিত জঙ্গিবাদবিরোধী কোনো কর্মসূচিও পালন করেনি। এ ছাড়া অন্যান্য জাতীয় দিবসের কর্মসূচিও প্রতিষ্ঠানটিতে পালন করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করে চলেছে, তা তাঁরা এত দিন খেয়াল করেননি। বিষয়টি জানার পর তাঁরা এখন বিব্রতবোধ করছেন। তাঁরা এও বলেন, ময়মনসিংহ শহরে ইংলিশ মিডিয়ামে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এই একটি প্রতিষ্ঠানই রয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে তাঁরা সন্তানদের এই প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানায়, একাত্তরে মোনেম খানের ভূমিকা কী ছিল, সে সম্পর্কে তারা জানে না।

গতকাল বুধবার অধ্যক্ষ নাসরীন মোনেম খানের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে ঢাকা আছেন বলা হলেও তাঁর ফোন নাম্বার এ প্রতিবেদককে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানটিতে দায়িত্বরতরা।

দায়িত্বে থাকা উপাধ্যক্ষ নীলুফার সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, কাগজপত্রের লেখার কোনো বিষয় নিয়ে তিনি বলতে পারবেন না। তিনি পড়াশোনার বিষয়টিই দেখেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানে জঙ্গি বা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি নতুন এসেছেন। এসব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনের ব্যাপারে তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। অন্বেষা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সম্পর্কেও তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ময়মনসিংহ জেলার সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার আব্দুর রব কালের কণ্ঠকে বলেন, শুরুর দিকে এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখন এভাবে ইতিহাস বিকৃতি করছে, তা তিনি জানতেন না। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে অবশ্যই কঠোর প্রতিবাদ করা হবে। ’


মন্তব্য