kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পরের ধনে পোদ্দারি!

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চটকদার ব্যবসায়ী হিসেবেই তাঁকে জানে খুলনার পরিচিত মহল। বিয়ে করার সুবাদে এখানে থিতু হয়েছেন তিনি।

একজন সাধারণ মানের ব্যবসায়ী থেকে প্রভাবশালী রপ্তানিকারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর এই উত্থানের পেছনে রয়েছে ব্যাংক থেকে নেওয়া শত শত কোটি টাকার ঋণ। সম্প্রতি এই ঋণের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে এখন তিনি অনেকটা আত্মগোপনে আছেন। মামলা থেকে রেহাই পাওয়ারও চেষ্টা করছেন।

বহুল আলোচিত এই ব্যবসায়ীর নাম টিপু সুলতান।

খুলনার দৌলতপুরে পাট ব্যবসা আছে টিপু সুলতানের। তাঁর আদি বাড়ি বগুড়ায়। ব্যবসা ও বিয়ের কারণে এখানেই রয়ে গেছেন। তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম ঢাকা ট্রেডিং হাউস।

দৌলতপুরের পাট ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, নানা কারণে এই ব্যবসায়ী আলোচিত। পাট রপ্তানিকারক এবং ব্যাংকপাড়ায় তাঁকে নিয়ে বেশ সরস আলোচনা চালু আছে। তিনি বেশি দামে পাট কিনে কম দামে রপ্তানি করে খুলনার পাট রপ্তানিকারকদের নজরে আসেন। পাট রপ্তানিতে স্বর্ণপদক পাওয়ার আশায় তিনি বাকিতে বেশি টাকায় অনেক পাট কেনেন, বেচেন কম দামে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একদিকে ব্যাপারিদের (ফড়িয়া) টাকা বাকি রাখা, অন্যদিকে গুদামে পাট দেখিয়ে রূপালী ব্যাংক দৌলতপুর করপোরেট শাখা থেকে প্লেজ ঋণ গ্রহণ করা টিপুর স্বভাবে পরিণত হয়। তারা বলে, এমন ‘আত্মঘাতী’ ব্যবসায়ী কৌশল আর চটকদারি মানসিকতার জন্য

টিপুকে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদাররাও ছেড়ে চলে গেছে। ঢাকা ট্রেডিং হাউসের যাত্রা পর্বে টিপুর সঙ্গে কয়েকজন অংশীদার ছিল। তারা সবাই একে একে টিপু সুলতানের সঙ্গ ত্যাগ করেছে।

ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, একসময় এই ঢাকা ট্রেডিং হাউসের নাম ছিল রেলি ব্রাদার্স। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাট মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে মাত্র ২২ কোটি টাকায় টিপু সুলতান রেলি ব্রাদার্স কিনে নেন। পরে দৌলতপুর রূপালী ব্যাংক শাখায় বন্ধক রেখে ৫২ কোটি টাকা ঋণ নেন। তখন ব্যাংকে এই সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয় ১১০ কোটি টাকা। এরপর অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলে এবং গুদামের পাট দেখিয়ে প্লেজ ঋণ নেন। সব মিলে এই ব্যাংকে টিপুর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১০ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ী হিসেবে টিপু সুলতানের চটকদারিত্বের পাশাপাশি তাঁর বিলাসী জীবনযাপন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি যে হাতঘড়িটি ব্যবহার করেন সেটার দাম ৫০ লাখ টাকা বলে দাবি করেন।

টিপুর ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে জানা যায়, ২২ ক্যারেটের সোনা দিয়ে তৈরি ওমেগা ব্র্যান্ডের ঘড়ি এটা। কেউ ঘড়ি দেখতে চাইলে তিনি আগ্রহভরে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আগ্রহীর কৌতূহল মেটান।

এ নিয়ে জানতে চাইলে টিপুর শ্যালক শেখ শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভগ্নিপতি ৫০ লাখ টাকা দামের ঘড়ি পরেন। দেখতে চাইলে চলে আসেন। ’

শাহীনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টিপু সুলতান তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ট্রেডিং হাউসের সীমানায় থাকা রেস্টহাউসে সপরিবারে বাস করেন। তবে নগরের লোয়ার যশোর রোডে সার্কিট হাউসের বিপরীতে একটি বহুতল ভবনে তাঁর দুটি ফ্ল্যাট আছে। তিনি জানান, টিপু সুলতান দৌলতপুরেই অবস্থান করছেন।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে হাওয়া ভবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ব্যবসায়ী টিপুর উত্থান ঘটে। ২০০৫ সালে চিনি আমদানির নামে জনতা ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ৩২১ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা অন্য খাতে সরিয়ে ফেলেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি নানাভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চিনি আমদানির নামে জনতা ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ৩২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করার ঘটনা তদন্ত করে কমিশন টিপুর বিরুদ্ধে মামলা করে। ঢাকা থেকে আসা কমিশনের একটি দল গত ৩১ মার্চ তাঁকে তাঁর খুলনার ব্যবসায়ী কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে।

জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন খুলনা থেকে ঢাকা কারাগারে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করার আগেই টিপু সুলতান স্থানান্তরিত হওয়ার আয়োজন করে ফেলেন। সেখানে অসুস্থতা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে থাকেন। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন। খুলনায় আসার পর ঢাকা ট্রেডিংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টিপুকে সাড়ম্বরে সংবর্ধনা দেন।

মামলা তদন্তকারী দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, উচ্চ আদালতে জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করার আগেই টিপু সুলতান মুক্তি পেয়ে যান। আপিল করার পর গত ২৮ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ হাইকোর্টের দেওয়া টিপুর জামিন বাতিল করেন।

 


মন্তব্য