kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঘাটতি বিশাল, তবু রপ্তানির চিন্তা

তৌফিক মারুফ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঘাটতি বিশাল, তবু রপ্তানির চিন্তা

দেশীয় উৎপাদনে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি আছে ৬১ শতাংশ। তবু আন্তর্জাতিক বাজারে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়ে তৈরি হয়েছে জাতীয় দুগ্ধ উন্নয়ন নীতিমালা ২০১৬।

ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত খসড়া তৈরির পর সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে, যা এখন মতামত গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এমন প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রকারান্তরে স্থানীয় বাজারে দেশীয় দুধের ঘাটতি আরো বাড়বে। শতভাগ চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য যাতে বিদেশে রপ্তানি করা না হয়—জাতীয় নীতিমালায় এমন কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়ার তাগিদও দিয়েছেন তাঁরা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘ইম্প্রুভিং ফুড সেফটি অব বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের সিনিয়র ন্যাশনাল অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, দেশীয় উৎপাদন দিয়ে আমরা আমাদের দুধের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। যেখানে আমরা বড় ঘাটতির মুখে আছি সেখানে রপ্তানির চিন্তা আসে কী করে! এটা তো দ্বিমুখী অবস্থান। বরং জাতীয় নীতিমালায় ঘাটতি পূরণই লক্ষ্য থাকা উচিত। নীতিমালায় ওই প্রসঙ্গ থাকলে এবং তা বাস্তবায়নের চিন্তা করলে বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, কাগজে ৬১ শতাংশ ঘাটতির কথা থাকলেও আসলে এ তথ্য ঠিক নয়। এখন বাস্তবে ঘাটতি ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা এ খাতে দ্রুত উন্নতি ঘটাচ্ছি। আর রপ্তানির পরিকল্পনার কথাটি তোলা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টির সুযোগ তৈরির জন্য। দেশের বাইরে আমাদের দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে অনেক বিদেশি বিনিয়োগও এ খাতে আমরা পেয়ে যেতে পারি, যা থেকে উৎপাদনের মাত্রায় আরো অগ্রগতি ঘটবে।

একই নীতিমালায় বিদেশ থেকে তরল ও গুঁড়ো দুধ আমদানিকে নিরুৎসাহী করাসহ আমদানিকৃত বা দেশে উৎপাদিত ওষুধ, টিকা, রোগ নিরূপণের কিট, অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডির মান নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দপ্তর—প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট আইন-বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয় ওই নীতিমালায়। আর এটাকে খুবই ইতিবাচক বলে মত দিয়েছেন একই বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া মানসম্মত দুগ্ধজাত সামগ্রী উৎপাদনের জন্য দুগ্ধ খামারে বিভিন্ন ওষুধসহ অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রোবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করার বিষয়টিকে প্রস্তাবিত নীতিমালায় গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দেওয়াকেও ইতিবাচক বলে দেখা হচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, দেশে গবাদি পশুর দুধ উৎপাদনে ঘাটতি থাকার কারণেই কৌটার দুধের বাণিজ্য হয়। কৌটার দুধ আমরা কোনোভাবেই ইতিবাচকভাবে দেখি না। এগুলো ছোট-বড়—সবার জন্যই ক্ষতিকর।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে বছরে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ৫০ লাখ (৫.০৬৭ মিলিয়ন) মেট্রিক টন (২০১২-২০১৩) পক্ষান্তরে, চাহিদা এক কোটি ৩০ লাখ (১৩.২ মিলিয়ন) মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৬১ শতাংশ। জাতীয় চাহিদা পূরণ করতে হলে দুধের উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বাড়াতে হবে। তরল দুধের ঘাটতি থাকার কারণে প্রতিবছর ব্যবসায়ীরা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ আমদানি করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধ নিম্নমানের, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

মহাপরিচালক যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মাছ, মাংসসহ অনেক পণ্যেই আমরা এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নই, বরং ঘাটতি রয়েছে। তবু এসব পণ্য রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা হচ্ছে। আর ওই খাতগুলোরও উন্নয়ন হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে প্রধানত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া—এই চার ধরনের প্রাণী দুধেল জাতের প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত। আর বর্তমানে দেশে দুই কোটি ৪০ লাখ ছাগল, দুই কোটি ৩০ লাখ গরু, ৩০ লাখ ভেড়া, ১০ লাখ চার হাজার মহিষ রয়েছে। এসব প্রাণীর মাধ্যমে বার্ষিক উৎপাদিত দুধের প্রায় ৯২ শতাংশ আসে গাভি থেকে। বাকি ৮ শতাংশ আসে মহিষ, ছাগল ও ভেড়া থেকে। আর দেশে মূলত দেশি ও সংকর জাতের গরু রয়েছে। মোট গরুর প্রায় ৮৫ শতাংশ দেশি এবং ১৫ শতাংশ সংকর জাত। দেশি গরুর দুধ উৎপাদনক্ষমতা খুবই কম, তবে এর মধ্যে আবার বেশ কয়েক ধরনের দেশি গরু রয়েছে, যেগুলো দুধ উৎপাদনক্ষমতা ভালো। এ ক্ষেত্রে রেড চিটাগাং গরু, পাবনার দুধেল গাভি, মুন্সীগঞ্জের সাদা গাভি এবং উত্তরবঙ্গের ধূসর গাভি উল্লেখযোগ্য।

প্রস্তাবিত নীতিমালার উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ডেইরি শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে দুগ্ধনীতিতে বর্ণিত সব কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন ও তদারকির লক্ষ্যে দেশে একটি জাতীয় দুগ্ধ উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা। জাতীয় দুগ্ধ উন্নয়ন বোর্ড পরিচালনার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা। দুধ, দুগ্ধজাত খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি। স্বাস্থ্যসম্মত ও ভেজালমুক্ত দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করা।   দুগ্ধজাত গবাদি পশুর খাদ্যের চাহিদা পূরণে উন্নত জাতের ঘাসের উৎপাদন। দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ দেশের আবহাওয়ার উপযোগী উন্নত জাতের গাভির জাত আবিষ্কার।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, জন্মের পর ছয়-সাত বছরের মধ্যেই মানব শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি শেষ হয়ে যায়। তাই শিশু অবস্থায় দুধের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। এ ছাড়া দুধে রয়েছে উন্নতমানের আমিষ, যার মধ্যে সব অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড বিদ্যমান থাকায় যেকোনো আমিষের তুলনায় এটিকে শ্রেষ্ঠ আমিষ বলা যায়। দুধের চর্বিতে প্রায় ৪০ শতাংশ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড এবং প্রচুর পরিমাণে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড বিদ্যমান থাকার জন্য এটি গরু, মহিষ, ছাগল, মুরগি ইত্যাদির মাংসের চর্বির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ নিরাপদ। এ ছাড়া দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়ামসহ অন্যান্য খনিজ পদার্থ। ফলে শিশুর সঠিক সময়ে দাঁত ওঠা, শরীরের অস্থির কাঠামো গঠন এবং বয়স্কদের অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। রাতে ঘুমের আগে এক গ্লাস দুধ খেলে ভালো ঘুম হয় এবং হাইপারটেনশন কমাতে এটি ব্যাপক ভূমিকা রাখে। দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, যা মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, বড়দের পুষ্টির জন্য প্রাণিজ খাদ্য হিসেবে দুধের ভূমিকা অনেক। তবে কথা হচ্ছে, এ দুধের পর্যাপ্ত জোগান আর যতটুকু পাওয়া যায় তা কতটা খাঁটি তা নিয়ে। কারণ এখন দেশের মানুষের মনে বড় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় সব সময়, সেটা হচ্ছে—দুধে পানি মেশানো হয়, নাকি পানিতে দুধ মেশানো হয়? এ ছাড়া নানা ধরনের কেমিক্যাল মেশানোর অভিযোগও রয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই কেবল উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। উৎপাদিত দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যকে ভেজালমুক্ত বা নিরাপদ করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

অবশ্য ওই নীতিমালায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের দুগ্ধ খামার স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করা, দুগ্ধ খামার স্থাপনের জন্য করণীয় বিষয়ে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, দুধ থেকে দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন ধরনের দুগ্ধপণ্য তৈরির ব্যাপারে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, দুগ্ধশিল্পের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি, বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা, ডেইরি খামার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, মিনি মিল্ক প্রসেসিং কেন্দ্র স্থাপন, ভ্যাকসিন ও গবাদি পশুর ওষুধ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা, কৃত্রিম প্রজননের কাজ সম্প্রসারণের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় এ নীতিমালার বিষয়ে বলেন, ‘এটা কেবল একটি খসড়া। আমরা সবার মতামত নেওয়ার জন্যই এটি উন্মুক্ত করে রেখেছি। প্রাপ্ত মতামত নিয়ে আরো অনেক পর্যালোচনার পর এটি চূড়ান্ত হবে। তাই যত প্রশ্ন উঠবে ততই ভালো হবে। আমরাও এ খসড়া  নিয়ে প্রশ্ন চাই, মতামত চাই। ’


মন্তব্য