kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঐতিহ্য

আলকাপ হারানো ট্রানজিস্টর

আহসান হাবিব, আঞ্চলিক প্রতিনিধি চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আলকাপ হারানো ট্রানজিস্টর

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জয়চাঁদ সরকারের বাড়িতে আলকাপের আসর। ছবি : কবি মামুন খানের সৌজন্যে

‘দেরে নারে, দেরে নারে, দেরে না...’ বেজে উঠল ডুগি, তবলা, খঞ্জনি। যেন টিনের চালায় ঝমঝম বৃষ্টির মাতম।

চারদিকে দর্শক, মাঝখানে ছোকরার কোমরে খেমটা। নাচে নাচে ধুতির নেংটি ট্যাংরা মাছের মতো তড়পায়। গানের সরকার যুক্তির ধার বদলিয়ে দেয় নিমেষেই। সামাজিক অসংগতিকে শ্লেষে শ্লেষে করে চুরমার। কথা আর গানে নিপীড়নকারীর ওপর চলে পীড়ন। ব্যস, দর্শকের হাতে তালি বাজে। মুখে বাহ! বেশ বেশ...।

খোলা জায়গায় চিটাগুড় পড়ে থাকলে যেমনটা হয়। আলকাপ গানের আসর বসলে পিঁপড়ার মতো সাত গ্রাম ভেঙে ছুটে আসে মানুষ। ভাদ্র মাসের পানি কমলে, অগ্রহায়ণ মাসে ঘরে ধান উঠলে, বৈশাখ মাসে ঝড় উঠলে, মাঘ মাসে খুব শীত নামলে—কথায় কথায় বসে পড়ে আলকাপ গানের আসর। সপ্তাহ ঘুরে হাটবার কিংবা পারিবারিক আয়োজন—আলকাপ গান না হলে হজম হবে না পেটের ভাত।

মূলত বাংলাদেশে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং ভারতের মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম অঞ্চলে এই গানের উৎপত্তি। এসব অঞ্চলের মানুষ এই গানকে ভালোবেসে লালন-সাধন করে জীবনের অনুষঙ্গ করে তুলেছে।

তবে এখন এই গান অনেকটা হারাতে বসেছে। আলকাপের সাধনাকারী অনেক শিল্পী প্রয়াত। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারোঘরিয়ার ঝড়ু পাল সরকারের খ্যাতি ছিল বেশ। তাঁর ছেলে জয়চাঁদ সরকার কোনোমতে দল টিকিয়ে রেখেছেন। তবে পরম্পরায় গানের দলকে টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে অন্তত এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০টি আলকাপ গানের দল ছিল। এখন প্রায় ২০ থেকে ২৫টি দল রয়েছে। এই গানের শিল্পী-সাধকরা মেহনতি মানুষ। কেবল নিজের আনন্দে এই গানকে টিকিয়ে রেখেছেন তাঁরা। পৃষ্ঠপোষকতা নেই বলে সংস্কৃতির এই সম্পদ হারাতে বসেছে আজ।

আলকাপ গানের দলের প্রধানকে সরকার বলা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকে একজন ভাঁড়। আলকাপের ভাষায় যাকে ‘কাপ্যাল’ বলা হয়। কাপ্যালের চরিত্র সব সময় দুই ভাই হিসেবে অভিনয় করে থাকে। দলে থাকে দুজন পুরুষ, যারা নর্তকী সেজে নাচ-গান আর অভিনয় করে। তাদের ‘ছোকরা’ নামে ডাকা হয়। গানের দলে থাকে কয়েকজন যন্ত্রবাদক। যন্ত্রীরা বসে বসে বাদ্যযন্ত্র বাজায় আর সরকার, কাপ্যাল, ছোকরা অভিনয় করে আসরের মাঝখানে। আলকাপ গান মূলত শুরু হয় গভীর রাতে কিংবা বিকেল থেকে। সারা রাত এই গান চলে।

গানের সময় কাপ্যালকে তার ভাই ‘পটলা’, ‘মদনা’ নামে ডাকে। সরকারের হাতে একটি এক্স-রে ফিল্ম পেঁচিয়ে লাঠি বানানো হয়। সেটিকে সরকার লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে কাপ্যালকে পেটায়। আর কাপ্যালের হাতে পাতলা বাঁশের কঞ্চি থাকে, যেটি দিয়ে মাঝে মাঝে আসরের ব্যবহৃত টিনের ছাউনিতে আঘাত করে শব্দ করে। ছোকরারা খেমটা ও ঝুমুর ঝুমুর নাচ নেচে আসর মাতিয়ে তোলে।

গানের সঙ্গে নাচের কম্বিনেশনে দর্শকরা উত্তেজনা অনুভব করে। রঙ্গরসের গানগুলো মনোমুগ্ধকর। যেমন—‘তুই যে আমার নতুন ট্রানজিস্টর। ’

শত কষ্টে এখনো চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী আলকাপ গানের দল টিকে রয়েছে। বর্তমানে গানের দল নিয়ে রয়েছেন পলশা এলাকার আব্দুস সালাম কেরামত সরকার, বালিয়াডাঙ্গা এলাকার ফজর আলী সরকার, যাদুপুরের মতিন সরকার, বারোঘরিয়ার জয়চাঁদ সরকার, সুনীল সরকার, লক্ষ্মীপুরের আব্দুস সালাম সরকার, মহারাজপুরের এসলাম সরকার, চৌডালার মুসলিম সরকার, চৈতন্যপুরের নবাব সরকার, লহালামারী চককীর্তি এলাকার ইয়াসিন আলী ফিটু সরকার, টিকরীর বজলু বায়েন সরকার ও মোহবুল সরকার, বড়গাছি এলাকার জোবদুল সরকার ও দয়াল সরকার, গোমস্তাপুর বোয়ালিয়া ইউনিয়নের আব্দুল আওয়াল সরকার, সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর এলাকার কালু সরকার, দেবীনগর হড়মা এলাকার রাজ্জাক সরকার, নাচোলের চেরু সরকার ও জেন্টু সরকার, নয়ালাভাঙ্গার সরকার সোলেমান ঘোষ ও রানীহাটি ঢোড়বোনা এলাকার পকির সরকার, নামোসংকরবাটির হাসেন সরকার প্রমুখ।

এ ছাড়া ছোকরা সঞ্জিত কর্মকার, পঞ্জলাল, জিতেন, বিপ্লব, মামুন, পাকু, রিপন, মনি, চয়ন, ফারুক, দর্শন, জোকার তোহুরুল বাউন, অভিনেতা ও জোকার কালুসহ শিল্পী ও সহশিল্পী মিলিয়ে আরো অন্তত ২৫-৩০ জন জড়িত এসব নিয়মিত ও অনিয়মিত দলের সঙ্গে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নশিপুর পলশা এলাকার সঞ্জয় সরকার সঞ্জিত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৯ বছর বয়স থেকে আলকাপ গানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। আমার শিক্ষাগুরু ছিলেন প্রয়াত ফজলুর রহমান সরকার। সংসারের অনটন মেটাতে কাজে নেসে পড়েছিলাম। কিন্তু ফজলুর রহমান সরকার আমার বাবা-মাকে এসে বললেন, বছরে ১২ মণ ধান খরচ হিসাবে দিব, তোমাদের ছেলে সঞ্জয়কে আমার আলকাপ দলে যোগ দিতে দাও। এরপর মনের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ি আলকাপ গানের সঙ্গে। সেই থেকে চলা শুরু, আর থেমে যাইনি। বছরে ২৫ থেকে ৩০টি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য ডাক পড়ে। একসময় প্রচুর লোকসমাগম হতো এবং এখনো লোকসমাগম ব্যাপক হয়ে থাকে। ’

আক্ষেপ করে সঞ্জয় সরকার আরো বলেন, ‘দলের প্রধান বা সরকার খরচ সংকুলান করতে না পারা, অনেকে নিরুৎসাহিত হয়ে দল গুটিয়ে নিয়েছে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিন দিন বিলুপ্ত হতে বসেছে আলকাপ গান। এখানে সরকারের জোর তদারকি থাকা উচিত। আর তা না হলে ঐতিহ্যবাহী আলকাপ গানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করতে চাইলে আঞ্চলিক পর্যায় থেকে এগোতে হবে। ’

আলকাপ গানের সরকার আব্দুস সালাম কেরামত বলেন, ‘৩৫ বছর আগে শুরু করেছিলাম আলকাপ গান। আলকাপ করে নিজে আনন্দ পাই, তেমনি দর্শক-শ্রোতারাও পান। কোথাও আয়োজন হলে আয়োজকরা কিছু খরচ দেন। অনেক সময় কম দিলে নিজ পকেট থেকে দিয়ে দলের সদস্যদের খুশি রাখতে হয়। আমার দাদা আব্দুস সাত্তার ছিলেন কবি ও আলকাপ গানের সরকার। আমার অন্য ওস্তাদ ছিল। আমার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্য আলকাপ দলে কাজ করছেন সঞ্জয়, তানোরের হেমন্ত, হবিবুর, ইসরাইল, রাজ্জাকসহ ৪০ থেকে ৫০ জন সরকার, বাদ্যযন্ত্রী, জোকার, অভিনয়শিল্পী কাজ। ’

আলকাপ গানের শিল্পীরা দাবি করেন, তাঁরা প্রথমত নিজের আনন্দে গান করেন। ঐতিহ্যবাহী এই গানের তেমন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এ ছাড়া বর্তমানে সমাজের লোকেরা হেয় চোখে দেখে তাদের। তাঁরা এ গানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান।

আলকাপ গানের গবেষক ড. মাযহারুল ইসলাম তরু জানান, আলকাপ গান আজ হারাতে বসলেও এর জনপ্রিয়তা এখনো অনেক। সমাজের অনেক অসংলগ্ন দিক ফুটে ওঠার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করে তোলে এই গান। আলকাপ গান লোকশিক্ষার একটি অন্যতম মাধ্যম। শিল্পকলা একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আলকাপ গানের দল টিকে থাকবে।

শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র কারিবুল হক রাজি বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী আলকাপ গান ধরে রাখার জন্য আমার ও পৌরবাসীর পক্ষ থেকে কোনো পৃষ্ঠপোষকতার দরকার হলে তা করা হবে। ’


মন্তব্য