kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নেই ইভ টিজিং রোধে

শরীফুল আলম সুমন   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নেই ইভ টিজিং রোধে

রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বের হয়ে গত ২৪ আগস্ট বখাটে ওবায়দুলের ছুরির আঘাতে আহত হয় সুরাইয়া আক্তার রিশা। অষ্টম শ্রেণির এই ছাত্রী মারা যায় চার দিন পর।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত রবিবার মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী নিতু মণ্ডলকে স্কুলে যাওয়ার পথে কুপিয়ে হত্যা করে বখাটে মিলন মণ্ডল। সাম্প্রতিক সময়ের এই দুই ঘটনায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীরাও অনিরাপদ বোধ করছে।

মেয়ে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে ইভ টিজিংয়ের শিকার হলেও তা রোধে ভূমিকা নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এমনকি এসব ঘটনার দায়ও নিচ্ছে না কেউ। একজন মেয়ে শিক্ষার্থী লোকলজ্জার ভয়ে অভিভাবকদের ইভ টিজিংয়ের কথা খুলে বলতেও পারছে না। আবার স্কুলেও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করার উপায় নেই। অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের উল্টো দোষারোপ করা হয়। কয়েক বছর আগে শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যৌন নির্যাতনবিরোধী কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু স্কুল-কলেজে এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো দায় নেই বলেই ইভ টিজিংয়ের মতো এসব ঘটনা বারবার এড়িয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা বিশেষ পোশাক পরেন। এতে বোঝা যায়, তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন। সাধারণ মানুষও তাঁদের সহায়তা করে। একইভাবে প্রতিটি স্কুল-কলেজেরও বিশেষ ড্রেস রয়েছে। ওই ড্রেস পরেই ছাত্রীরা স্কুলে যায়। তাই তাদেরও সব ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট ড্রেস পরার কোনো সুবিধা তো পাচ্ছেই না বরং উল্টো তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে স্কুল ড্রেস পরা মেয়ে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ইভ টিজিংয়ের শিকার হচ্ছে।

মেয়ে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের ইভ টিজিং বা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সভা বা শোক প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করে। নিতু মণ্ডলের মৃত্যুর পর গত সোমবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভ টিজিং প্রতিরোধে করণীয় শীর্ষক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে ছাত্রীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা অনেক কমে এসেছে। তবে এখনো পত্রপত্রিকায় ছাত্রী লাঞ্ছনার খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে। অভিভাবকরাও মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে ভয়াবহ মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকেন। ’

মন্ত্রী বলেন, নারী শিক্ষা বিস্তারে ছাত্রী লাঞ্ছনা পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে। কেবল আইনের মাধ্যমে এ ধরনের সামাজিক ব্যাধির প্রতিকার সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন ইভ টিজিংবিরোধী ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ সচেতন জনসাধারণ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কলেজ পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি রয়েছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সম্প্রতি জঙ্গিবাদবিরোধী কমিটিও হয়েছে। তারা ইভ টিজিংয়ের মতো বিষয়গুলোও দেখবে ও প্রতিরোধে কাজ করবে। যেহেতু সাম্প্রতিক সময়ে দুটি বড় ঘটনা ঘটেছে তাই মন্ত্রণালয় সভা করে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেওয়া, তাদের কোনো সমস্যা আছে কি না তা দেখা। শিক্ষকরা গ্রুপ করে এই কাজগুলো করবেন। ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ জনসাধারণকেও সচেতন করা হবে। তবে এই ব্যাপারগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা আকারে দিলে ভালো হয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরো আলোচনা করব। ’

রাজধানীর কিশলয় উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান মেয়েদের। তাই দায়িত্বটাও বেশি। আমরা মেয়েদের বলেছি, কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে তোমরা আমাদের জানাবে। একজন বিপদে পড়লে তাকে ফেলে অন্যরা পালিয়ে আসবে না। সবাই একসঙ্গে প্রতিরোধ করবে। বিষয়গুলো আমরা অ্যাসেম্বলিসহ নানা সময়ে মনে করিয়েও দেই। আর এতে কাজও হচ্ছে। আমার স্কুলের কয়েকটি মেয়ে একটি ছেলেকে ঘিরে রেখে আমাদের ফোন দিয়েছে। এরপর আমরা ওই বখাটেকে পুলিশে তুলে দিয়েছি। ’

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির একজন ছাত্রীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমার মেয়েটা একাই কলেজে যায়। কিন্তু সম্প্রতি দুটি ঘটনার পর সে কলেজে গেলেই ভয়ে থাকি। অনেক সময় মেয়েরা মা-বাবার সঙ্গে সব কথা শেয়ার করে না। স্কুলের শিক্ষকরা যদি আন্তরিক হন, তাহলে হয়তো তাঁদের কাছে বলতে পারে। কিন্তু শিক্ষকদের ওরা আরো বেশি ভয় পায়। সাধারণত একদিনে কোনো ঘটনা ঘটে না। তাই মেয়েরা যদি ইভ টিজিংয়ের ঘটনা শেয়ার করতে পারে তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। মেয়েদের সঙ্গে অভিভাবক-শিক্ষকদের শেয়ারিংটা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। ’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘ইভ টিজিং প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যায়, পরিচালনা কমিটি হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে। ফলে যে এলাকায় স্কুল, সেখানকার গণ্যমান্য বা শিক্ষানুরাগীরা বিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছেন না। ফলে তাঁরা অনেক কিছুই জানেন না। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কার্যকর নেতৃত্ব থাকতে হবে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষকদেরও আরো আন্তরিক হতে হবে। ’

 


মন্তব্য