kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গবেষণা

ইলিশে ‘সোনার’ ডিম

তৌফিক মারুফ   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইলিশে ‘সোনার’ ডিম

গল্পের সেই গেরস্তের কথা কার না মনে আছে। ঘরের পোষা হাঁস রোজ একটি করে ডিম দেয়।

প্রতিদিনের জমা হওয়া ডিম যেন সোনার টুকরা। ব্যস, মনে লোভ জন্মায় গেরস্তের। সে ভাবতে থাকে হাঁসের পেটের সব ডিম যদি একসঙ্গে পাওয়া যেত? যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। ফেড়ে দিল হাঁসের পেট, এরপর যা দেখল, তা সবারই জানা।

এই গল্পের শেষটা সর্বনাশের। অতি লোভের পরিণতি যেমনটা হয়। তবে আর লোভে নয়, এবার গবেষণা। হাঁসও নয়, ইলিশ। ডিম ফুটিয়ে জলাশয়ে ইলিশ চাষের স্বপ্ন দেখছেন আমাদের দেশের গবেষকরা।

বিশেষ করে ইলিশের ডিম বিশেষ কায়দায় সংরক্ষণ করে তা প্রজননকাজে ব্যবহার নিয়ে শুরু হয়েছে গবেষণা। গত বছর থেকে একদল ইলিশ গবেষক এ গবেষণা শুরু করলেও এবার তা অনেকটাই জোরালো হয়ে উঠেছে। এ কাজের জন্য নদীতে নদীতে রাত-দিন ঘুরছেন ইলিশ গবেষকদলের সদস্যরা। এখনো চলছে এ কাজ।

ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএফআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান গতকাল সোমবার বিকেলে মেঘনা নদীতে ডিমওয়ালা ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ওই সময় মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এর আগে আমরা ইলিশের কৃত্রিম চাষ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। সেটা খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। তবু ওই কাজ এখনো চলছে।   ওই প্রক্রিয়ায় নদী থেকে ইলিশ ধরে তা অন্য জলাশয়ে ছেড়ে দিয়ে বড় করার চেষ্টা হচ্ছে। এরপর আমরা ইলিশের ডিম নিয়ে গত বছর থেকে কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু কিছুটা এগিয়ে আর শেষ করতে পারিনি। এবার আমাদের কাজ খুবই ইতিবাচক গতিতে এগিয়ে চলছে। আশা করি এবার আমরা সফল হব। ’

ওই গবেষক আরো বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও ডিম দিয়ে প্রজনন করার নজির নেই। আমরা সেই কাজে সফল হওয়ার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে অর্ধেকটা সফল হয়েছি। বাকি অর্ধেকও আশা করি সফল হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা ডিমওয়ালা ইলিশ ধরার পরপরই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিম বের করে তা নিয়ে কৃত্রিম প্রজনন ঘটানোর চেষ্টা করছি। এতে সফল হলেই ওই ইলিশ রেণু আমরা নদীতে ছেড়ে দিতে পারব। এটা একটা বিশাল কাজ হবে। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে ইলিশের প্রজনন ঘটানো গেলে ইলিশের উৎপাদন নিয়ে আর কোনো চিন্তা থাকবে না। ’

গবেষকরা জানান, সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ইলিশের প্রজনন হার হচ্ছে ডিমের তুলনায় পরস্ফুিটনের ৫০ শতাংশ। আর রেণু থেকে ইলিশের পরিণত হওয়ার হার ১০ শতাংশ। কিন্তু কৃত্রিমভাবে প্রজনন ঘটানো গেলে এই হার আরো বেশি হতে পারে।

মত্স্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ১১ দিনে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকার সফলতার সমীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন, প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ ইলিশ মাছ শিকার থেকে রক্ষা পেয়েছিল, যা থেকে প্রায় চার লাখ ১৭ হাজার ৭৬৫ কেজি ডিম প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদিত ডিমের পরস্ফুিটনের হার ৫০ শতাংশ হিসাবে প্রায় দুই লাখ ৬১ হাজার ১০৩ কোটি রেণু উৎপাদিত হয়েছে এবং ওই রেণুর বাঁচার হার ১০ শতাংশ হিসাবে ধরে প্রায় ২৬ হাজার কোটির বেশি পোনা বা জাটকা ইলিশ উৎপাদন হয়েছে।

তবে গবেষক আনিসুর রহমান বলেন, ‘আপাতত আমরা জীবিত ইলিশ থেকেই ডিম সংগ্রহ করে প্রজননের চেষ্টা চালাচ্ছি। মৃত ইলিশের ডিম কার্যকর হবে কি না তা নিয়ে এখনো ভাবিনি। যদিও সাধারণ হিসাবে এটা না হওয়ারই কথা। তবে ডিম থেকে কৃত্রিম প্রজনন সফল হলে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরায় আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে। এতে ইলিশের উৎপাদনও বাড়বে। ’

এদিকে ইলিশ রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকলেও এবারও চাঁদপুর, বরিশাল, বরগুনা, চট্টগ্রামসহ ইলিশপ্রধান আরো বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর পরিমাণ ইলিশের ডিম দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।


মন্তব্য