kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্যাপক সাড়া র‍্যাব পুলিশের অ্যাপে

এস এম আজাদ   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাপক সাড়া র‍্যাব পুলিশের অ্যাপে

‘তাদের কাজকর্ম সন্দেহজনক। প্লিজ, তদন্ত করে দেখুন...।

’ এটি মোবাইল ফোনে পুলিশের বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে পাঠানো একটি খুদে বার্তার অংশবিশেষ। রাজধানীর ধানমণ্ডি থেকে পাঠানো এ বার্তার সঙ্গে প্রেরকের নাম-ঠিকানা ছিল না। তবে তার সন্দেহের ব্যাপারে তথ্য ছিল।

বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য লিখে নেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এরপর সন্দেহভাজনদের গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু হয়। যাচাই করা হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যও। এভাবে জনগণের দেওয়া তথ্যে বেগবান হচ্ছে পুলিশ ও র‍্যাবের জঙ্গি প্রতিরোধের কার্যক্রম।

ধারাবাহিক টার্গেটেড কিলিং এবং রাজধানীর গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ও র‍্যাব মোবাইল ফোন অ্যাপ চালু করে জনগণের কাছে জঙ্গি তৎপরতাবিষয়ক তথ্য চাইতে শুরু করে। নিখোঁজ ও সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। তাদের তৎপরতায় আতঙ্ক কেটেছে, স্বস্তি ফিরেছে। সাধারণ মানুষ এখন জঙ্গিদের বিষয়ে পুলিশ-র‍্যাবকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানও চলছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, র‍্যাবের অ্যাপ ‘রিপোর্ট টু র‍্যাব’-এ প্রায় আড়াই মাসে আট হাজার ৬৯১টি বার্তা পাঠিয়েছে মানুষ। এসবের মধ্যে সরাসরি জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ২২১টি বার্তা রয়েছে। আর ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ‘হ্যালো সিটি’ অ্যাপে এক মাসে জমা পড়েছে তিন হাজার ৮৮টি বার্তা। এসবের মধ্যে সরাসরি জঙ্গিসংশ্লিষ্ট বার্তা ৮০৫টি।

পুলিশ ও র‍্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের তথ্য ও সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত আড়াই মাসে অন্তত ৫০টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৬০ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং ২৭ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।   রাজধানীর বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। এখন বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা গড়ে তুলতে পারছে না জঙ্গিরা। তারা জানান, ফোনেও পরিচয় গোপন করে পুলিশ ও র‍্যাবকে তথ্য দিচ্ছে অনেকে। এসব তথ্য যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রেপ্তার হওয়া ৬০ জনের মধ্যে ৪৮ জন নব্য জেএমবির ও দুজন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। আর ১০ জন সন্দেহভাজন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, গুলশানের ঘটনায় দেশে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে ভিন্নমাত্রার শঙ্কা তৈরি হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় শঙ্কা কমতে শুরু করেছে। পুলিশ জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলনের মতো একটি কাজ করছে। এ উদ্যোগ জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

র‍্যাব সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ১১ জুলাই ‘রিপোর্ট টু র‍্যাব’ অ্যাপ চালু করা হয়। গতকাল পর্যন্ত এতে আট হাজার ৬৯১টি রিপোর্ট পাঠিয়েছে সাধারণ মানুষ। এসবের ২২১টি জঙ্গিসংক্রান্ত। এ ছাড়া মাদকসংক্রান্ত এক হাজার ৫৯৬টি, সন্ত্রাসীদের বিষয়ে ৬৬২টি, সোশ্যাল মিডিয়ার অভিযোগ ৪৫১টি, নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে ২২০টি, ডাকাতি বিষয়ে ২২৩টি, হত্যা বিষয়ে ১২৩টি, অপহরণ বিষয়ে ১০৩টি এবং অন্যান্য বিষয়ে পাঁচ হাজার ৯০টি রিপোর্ট রয়েছে।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘অ্যাপটি চালুর পর থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। অনেক সচেতন নাগরিক এটি ডাউনলোড করেছে। তারা পরিচয় গোপন রেখে বা জানিয়ে সন্দেহভাজন জঙ্গি, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও অন্যান্য অপরাধীর ব্যাপারে তথ্য দিচ্ছে। পরিচয় জানালে তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা দেখছি। সেসব তথ্য বা অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে। প্রথম উদ্যোগ বলেই হয়তো কিছু অসম্পন্ন ও মিথ্যা তথ্য আসছে। তবে আমরা সব যাচাই করে দেখছি। ’

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গত ৩১ জুলাই ‘হ্যালো সিটি’ অ্যাপ উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এতে তিন হাজার ৮৮টি বার্তা দিয়েছে মানুষ। এসবের মধ্যে জঙ্গিসংশ্লিষ্ট বার্তা ৮০৫টি। এ ছাড়া সাইবার ক্রাইমসংক্রান্ত ৭২৭টি; বোমা, অস্ত্র ও মাদকের তথ্য ৮৬৯টি; আন্তদেশীয় অপরাধ বিষয়ে ৬৮৩টি বার্তা রয়েছে। শুধু বাংলায় নয়, আরবি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন দেশ থেকে বার্তা আসছে। আগস্ট মাসে এটি ২৯ হাজার ৮৪৩ বার ডাউনলোড করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী, সমন্বয়ক নূরুল ইসলাম মারজানসহ জঙ্গিদের বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এসব অ্যাপের মাধ্যমে। ‘হ্যালো সিটি’র মাধ্যমে পাওয়া তথ্য থেকে পুলিশ অনেক জঙ্গি আস্তানা সম্পর্কে খোঁজ পেয়েছে। বেশ কিছু জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। অনেকে পুলিশকে ফোন করেও খবর দিচ্ছে। রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের গতিবিধির ব্যাপারে স্থানীয়রা পুলিশকে তথ্য দিয়েছিল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘হ্যালো সিটি’তে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সব তথ্য সঠিক না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে। অনেকে পরিচয় গোপন রেখে, আবার কেউ পরিচয় দিয়ে বা তথ্যদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর দেয়। তিনি বলেন, ‘এতে আমাদের তথ্যগুলো যাচাই করতে সুবিধা হয়। যারা অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারছে না তারা কাছের থানায় বা আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগে তথ্য দিতে পারে। নিরাপত্তার স্বার্থে অবশ্যই পরিচয় গোপন রাখা হবে। ’

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে অনেক চিন্তাভাবনা করে এই অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য—জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে ব্যাপকভাবে জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা। এতে সাড়া মিলছে। মানুষ সচেতন হয়ে উঠছে। জঙ্গিরা এখন বাসা ভাড়া পাচ্ছে না—আমাদের কাছে এমন তথ্য আসছে। ’


মন্তব্য