kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিষিদ্ধ যানে নিভছে জীবনপ্রদীপ

এবার ঈদুল আজহা মৌসুমের ১১ দিনে প্রাণহানি ২০০ ছাড়িয়েছে

পার্থ সারথি দাস   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নিষিদ্ধ যানে নিভছে জীবনপ্রদীপ

ঢাকার রাস্তায় চলাচলের জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল বাসটির। তবে ঈদযাত্রী পরিবহনের জন্য বাসটি মহাসড়কে চলছিল।

আগের রাতে কুড়িগ্রাম থেকে কমপক্ষে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হয়েছিল এটি। শনিবার সকাল ৭টা ১০ মিনিটে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ইচাইলে পৌঁছালে বাসটির সামনের ডান দিকের চাকা ফেটে যায়। বিপরীত দিক থেকে আসা ইটবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে ওই বাসের সংঘর্ষে পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে। জাবালে নূর পরিবহনের বাসটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৭৭৭২। পুলিশ বাসটির কোনো কাগজপত্র পায়নি।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিষিদ্ধ মাহেন্দ্র। মহাসড়কে মাদারীপুরের রাজৈরের বড় ব্রিজ এলাকায় গত শুক্রবার দুপুরে সমুদ্রসৈকত পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে নিষিদ্ধ মাহেন্দ্র পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে। মহাসড়ক পুলিশের ভাঙ্গা থানার উপপুলিশ পরিদর্শক মো. মহসীন গতকাল রবিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই দুর্ঘটনার পর রাজৈর থানায় মামলা হয়েছে। সাত আসনের মাহেন্দ্র গাড়িটি আমাদের ভাঙ্গা থানায় আছে। ’ তিনি জানান, এটির কোনো নম্বর প্লেটও নেই। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভুরঘাটা, টেকেরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মাহেন্দ্র শুধু পণ্য নয়, যাত্রীও পরিবহন করছে।

চোখে ভালো দেখালেও কোনো বাস কারিগরি ত্রুটি নিয়ে, কোনোটি আবার ভাঙাচোরা দেখালেও বৈধ কাগজ জোগাড় করে মহাসড়কে চলছে। ঈদ মৌসুমে মহাসড়কে চলাচলের অনুমোদনহীন ঢাকার লোকাল বাস ছাড়াও মাহেন্দ্র, ইজিবাইকসহ নিষিদ্ধ বিভিন্ন যানবাহনে প্রাণ ঝরে গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএর হিসাবে, গত ৯ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট দিনেই প্রাণ গেছে ১২২ জনের। বেসরকারি হিসাবে ৯ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত ১১ দিনে প্রাণহানি ২০০ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ঈদের মৌসুমে ১৮৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এ তথ্য প্রকাশ করার পর আমাদের সংগঠনকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। সরকার সমালোচনা গ্রহণ করে ব্যবস্থা নিলে এ প্রাণহানি কমত। গত ঈদুল ফিতরের মৌসুমের চেয়ে ঈদুল আজহায় সড়কে প্রাণহানি বেশি হয়েছে। ’

দায়িত্বরত মহাসড়ক পুলিশ সদস্য, বাসচালক ও যাত্রীদের কাছ থেকে জানা গেছে, তিন চাকার সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি, মাহেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহাসড়ক।   নগরীর রাস্তার লোকাল বাস ও স্থানীয় সংযোগ সড়কের বিভিন্ন ধরনের এসব নিষিদ্ধ যানবাহনের মহাসড়কে চলাচলের উপযোগিতাও নেই। দ্রুতগতির বাসের সঙ্গে ধীরগতির এসব যানবাহনের সংঘর্ষে প্রাণ যাচ্ছে যাত্রীদের। সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, দেশে ধীরগতির নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহন আছে প্রায় ১৫ লাখ। তার বাইরেও নিষিদ্ধ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রয়েছে। পুরনো বাস, মাইক্রোবাস ও বিভিন্ন ধরনের গাড়ি কেটে, কৃষিকাজের যানবাহন রাস্তায় নামিয়ে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সোমবার রাজধানীর ডিআরইউ মিলনায়তনে মিট দ্য রিপোর্টার্স অনুষ্ঠানে বলেছেন, ব্যাটারিচালিত গাড়ি কী পরিমাণ আছে, তা কল্পনা করা যায় না।

জানা গেছে, স্থানীয় রাজনীতিক, পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির উৎস হিসেবে বছরের পর বছর চলছে এসব যানবাহন। গত বছরের ১ আগস্ট থেকে দেশের ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। গ্যাস সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এসব বাহন মহাসড়কে চলতে পারবে না। তবে বেশির ভাগ মহাসড়কে এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল দাবি করেছেন, ৮৫ শতাংশ এলাকায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। তবে নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের অটোরিকশা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ যানবাহন ব্যাপক হারে বাড়ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, অবস্থা এমন যে এসব যানবাহনের জন্য শহর ও মহানগরী এবং মহাসড়কে দ্রুতগতির গাড়ি চালানো সম্ভব হবে না। ইজিবাইকের বিকল্প যানবাহন বের করতে তিনি বিআরটিএকে বলেছেন। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ বেপরোয়া গাড়ি চালানো বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিআরটিএর কাছে অননুমোদিত সব ধরনের যানবাহনের তথ্য নেই। কারণ এসব যানবাহনের কিছু শ্রেণির কিছুসংখ্যক যানবাহনের নিবন্ধন আছে। বিআরটিএর সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশে ২০ ধরনের ২৬ লাখ ৬৯ হাজার ৫৪৬টি যানবাহনের নিবন্ধন আছে। তার মধ্যে ধীরগতির দুই লাখ ৩২ হাজার ৯১৫টি অটোরিকশার, টেম্পোর ১৭ হাজার ৫৯৮টির, হিউম্যান হলারের ১১ হাজার ৯৮৪টির নিবন্ধন আছে। কিন্তু মাহেন্দ্র, নছিমন, করিমন, ভটভটির মতো যানবাহনের কোনোটির নিবন্ধন নেই। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের সভায় প্রতিবছরই এসব যানবাহন চলাচল বন্ধের সুপারিশ করা হয়ে থাকে। তার পরও এগুলোর চলাচল বন্ধ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সমীক্ষানুসারে, দেশে নিবন্ধনহীন অটোরিকশা আছে চার লাখ, নছিমন-করিমন আছে আট লাখ, হিউম্যান হলার আছে দুই লাখ, মাহেন্দ্র আছে ৪০ হাজার। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, সরকারি সংস্থা বিআরটিএর কাছে নিবন্ধিত ও বৈধ গাড়ির তথ্য আছে। তার বাইরে কী পরিমাণ অবৈধ ও নিষিদ্ধ গাড়ি আছে তার তথ্য সংস্থার কাছে নেই। নিষিদ্ধ এসব যানবাহন টিকিয়ে রেখেছেন রাজনীতিবিদরা।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে নিবন্ধিত ২৬ লাখ ৬৯ হাজার ৫৪৬টি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রচালিত গাড়ির বিপরীতে কমপক্ষে তিন লাখ যন্ত্রচালিত গাড়ির ফিটনেস নেই।

বিআরটিএতে নিবন্ধিত ২০ ধরনের গাড়ির মধ্যে রাজধানীতে চলাচল করছে পাঁচ হাজার বাস-মিনিবাস। ফিটনেস ছাড়াই চলছে এগুলোর শতকরা ৮৮ ভাগ। এগুলোর আয়ুষ্কাল ২০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে ২০০২ সালে।

গাড়ির নির্মাণকালীন নকশা অক্ষত থাকা, ব্রেক-গিয়ার ঠিক থাকা, দরকারি বাতি থাকা, কালো ধোঁয়া বের না হওয়া, রং ঠিক থাকলেই কেবল গাড়ি রাস্তায় চলাচলের উপযোগী বলা যাবে। মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৪ অনুসারে, ফিটনেস পেতে অন্তত ৩৬ ধরনের কারিগরি ও বাহ্যিক বিষয় পরীক্ষা করতে হয়। মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৪ অনুসারে, মোটরসাইকেল ছাড়া বাস-মিনিবাস বা প্রাইভেট কারের মতো গাড়ির বছরে একবার ফিটনেস পরীক্ষা করাতে নিতে হয় বিআরটিএ অফিসে। বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শকরা তা খালি চোখেই পরীক্ষা করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘুষ দিয়ে ফিটনেস সনদ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষা না করিয়ে ১০০ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে গাড়ির ফিটনেস সনদ সংগ্রহ করা হয়। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, দেশে ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে সংঘটিত দুর্ঘটনার শিকার গাড়িগুলোর মধ্যে ৬০ হাজার ৬৬১টি গাড়ি ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে ধরা পড়েছে।

বিআরটিএর তথ্যানুসারে, ২০১৫ সালে দেশে দুই হাজার ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৩৭৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গত জুলাই পর্যন্ত এক হাজার ৪৮৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪২২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব প্রাণহানির বড় একটি অংশ ঘটেছে নিষিদ্ধ যানবাহনের সঙ্গে দ্রুতগামী পরিবহনের সংঘর্ষে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে হালকা যানবাহন গ্রাম্য সড়কে চলাচল করছে। কিন্তু এগুলো মহাসড়কে চললে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিআরটিএ এসব যানবাহনের হিসাব রাখে না। কারণ কৃষিকাজের জন্য যন্ত্র এনে যানবাহন তৈরি করা হচ্ছে। এ ধরনের যানবাহন মহাসড়কে চলাচলের উপযুক্ত নয়।

প্রসঙ্গত, ঈদুল আজহা পালিত হয়েছে গত ১৩ সেপ্টেম্বর। তার আগে মূলত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ঈদযাত্রার মূল চাপ শুরু হয়। ঈদের পর থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মস্থলে ফেরা চলছে। এখনো বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা শেষ হয়নি।


মন্তব্য