kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দায় স্বীকার করে বখাটে মিলনের জবানবন্দি

কঠোর শাস্তির দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর মানববন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও মাদারীপুর প্রতিনিধি   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দায় স্বীকার করে বখাটে মিলনের জবানবন্দি

স্কুল ছাত্রী নিতু মণ্ডল হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গত রবিবার রাতে নিতুর বাবা নির্মল মণ্ডল বাদী হয়ে কালকিনি উপজেলার ডাসার থানায় এ মামলা করেন।

এতে বখাটে মিলন মণ্ডলকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার পুলিশ আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করলে মিলন হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিতুর হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। পাশাপাশি ইভ টিজিং প্রতিরোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নিতু হত্যার প্রতিবাদে এবং মিলনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল সকালে উপজেলার নবগ্রাম হাই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে। নিতু ওই স্কুলের নবম শ্রেণিতে পড়ত।   

নিতুর বাড়ি উপজেলার ডাসার থানার নবগ্রাম ইউনিয়নের আইসারকান্দি গ্রামে। মিলনের বাড়িও একই গ্রামে। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিলন নিতুর ছোট ভাইকে প্রাইভেট পড়াত। পরিবার ও নিতুর সহপাঠীরা জানায়, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে নিতুকে উত্ত্যক্ত করত মিলন। তার প্রেমের প্রস্তাব একাধিকবার ফিরিয়ে দিয়েছে নিতু। তবু পিছ ছাড়েনি মিলন। গত রবিবার সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে নিতুকে বাধা দেয় মিলন। প্রতিবাদ করলে সে ছুরি দিয়ে নিতুর পেট ও পিঠে আঘাত করে। একের পর এক আঘাতে নিতু পাশের খালে পড়ে যায়। এ সময় তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে মিলন দ্রুত পালিয়ে যায়। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায় নিতু। পরে স্থানীয় লোকজন মিলনকে ধাওয়া করে একটি বিলের মধ্য থেকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরে নিতুর লাশ গ্রামে নিয়ে আসে স্বজনরা। মরদেহ প্রথমে নবগ্রাম হাই স্কুল মাঠে রাখা হয়। এ সময় শিক্ষক ও নিতুর সহপাঠীসহ অন্য শিক্ষার্থীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেখান থেকে লাশ বাড়িতে নেওয়া হলে আরো শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মা-বাবা, ছোট ভাই, আত্মীয়স্বজনসহ গ্রামবাসী আহাজারি করতে থাকে।  

মা নিপা মণ্ডল কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল নিতুর। গ্রামের মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার স্বপ্ন ছিল ওর। স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ও অনেক পুরস্কার পেয়েছে। আমার হাসি-খুশি মেয়েটাকে এভাবে মরতে হবে ভাবিনি। ওর মৃত্যুতে আমার সব শেষ হয়ে গেল। ’ কথা বলেন আর মেয়ের জামাকাপড়, বই-খাতা ধরে আহাজারি করতে থাকেন মা।

ছোট ভাই দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র দীপ্ত মণ্ডল বলে, ‘দিদি আমাকে পড়াশোনা দেখিয়ে দিত। এখন কে আমার পড়া দেখিয়ে দেবে। এখন কাকে দিদি বলে ডাকব?’

সহপাঠী সম্পা, কলি, মুক্তাসহ আরো অনেকেই বলে, সব সময় হাসি-খুশি থাকত নিতু। তাকে সবাই পছন্দ করত। স্কুলের সব প্রতিযোগিতায় সে অংশ নিত। পুরস্কারও পেয়েছে অনেক। গ্রামের যেকোনো অনুষ্ঠানে সে নাচ-গানে অংশ নিত। পড়াশোনায়ও খুব ভালো ছিল। এভাবে তার মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।

গ্রামবাসীও প্রিয় নিতুর এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। মিলনের কঠোর শাস্তি দাবি করেছে তারা। একই দাবিতে গতকাল সকাল ১১টার দিকে নবগ্রাম হাই স্কুলের উদ্যোগে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও গ্রামবাসী অংশ নেয়। তারা মিলনের ফাঁসির দাবি জানায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডাসার থানার এসআই বায়েজিদ মৃধা জানান, নিতু হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি গতকাল ঘটনাস্থলের পাশের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল মিলনকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় সে হত্যার কথা স্বীকার করে মাদারীপুর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের জ্যেষ্ঠ হাকিম ফৌজিয়া হাফসার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে আদালত তাকে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

 

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর : নিতুর হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ইভ টিজিং প্রতিরোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ইভ টিজিং প্রতিরোধে করণীয়’ নির্ধারণে গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। মন্ত্রী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতসহ ছাত্রীদের চলাফেরায় নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।  

বৈঠকে সভাপতিত্বকালে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে ছাত্রীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা অনেক কমে এসেছে। তবে এখনো পত্রপত্রিকায় সন্ত্রাসীদের হাতে ছাত্রী লাঞ্ছনার খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে। ’ বৈঠকে শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় তিনি নিতুর হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।


মন্তব্য