kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নাড়ির টান

তবু জীবন ভাঙেনি পদ্মায়

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তবু জীবন ভাঙেনি পদ্মায়

এভাবেই বারবার পদ্মায় বিলীন হয়েছে ভিটামাটি। এর পরও টিকে আছে চরবাসী। ছবি : সালাহ উদ্দিন

ঈদে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরল কত মানুষ। বাপ-দাদার ভিটায় দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলেছে কত স্বজনের।

যে মাটিতে জন্মের নাড়ি পোঁতা, যে মাটির নিচে পূর্বপূরুষ শুয়ে আছে, সেখানে উত্তরাধিকারী পৌঁছবেই। এই মর্ম, এই অনুভূতি গৌরবময়। কিন্তু প্রতিটি গৌরবের উল্টো পৃষ্ঠা কত দুঃখের, কত দগদগে!

ফলে সবার তা হয়ে ওঠে না। নাড়ি পোঁতা আছে ভিটায়, কিন্তু ভিটাটুকু চলে গেছে পদ্মায়। আবার অনেকের বাড়ি ফেরার আকুতিটুকু বড়জোর চোখের পানি। ‘জীবন এমনই’—সান্ত্বনার এই বাক্যটুকু বেঁচে থাকার সম্বল। হ্যাঁ, প্রান্তিক, ছিন্নমূল, কিংবা একা হয়ে যাওয়া নাগরিক জীবনের এইতো অন্তঃসার। তবু জীবন। আপদে-বিপদে-সংগ্রামে বেঁচে থাকার লড়াই হয়তো প্রকৃত গৌরবের।

রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মার চরের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা জালাল উদ্দিন। বাপ-দাদার আমল থেকে ছিলেন চরখানপুরের বাসিন্দা। জালালের নিজেরই ছিল ৬০ বিঘা জমি। ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু। চরের জমির ধান দিয়েই সংসার চলত সারা বছর। এই খানদানি বছর বিশেক আগের। এরপর পদ্মার গর্ভে একে একে জমিগুলো বিলীন হয়ে গেল। একসময় বাপ-দাদার ভিটামাটিতে আঘাত হানল প্রমত্তা পদ্মা। ব্যস, সব শেষ। পরে সেখান থেকে সরে এসে পরিবার নিয়ে একটি ঘর তৈরি করেন জালাল উদ্দিন। কিন্তু আবারও সেই পদ্মার ভাঙন।  

এভাবে বছরের পর বছর পদ্মা গিলে খায় ঘরবাড়ি। জালাল উদ্দিন আবারও তৈরি করেন ঘর। এ যেন ভাঙন বনাম জীবনের খেলা। কিন্তু দমে যাননি জালাল উদ্দিন। শুকনো মৌসুমে চরখানপুর ছেড়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় গড়েন জেগে ওঠা চর পদ্মার মাঝখানে। ওই চরে তিনিই প্রথম বাসিন্দা। কারণ এখনকার এই চর একসময় তাঁর বাপ-দাদার ভিটা ছিল। সেখানেই ছিল পূর্বপুরুষের কবর।

জালাল উদ্দিন বলেন, ‘একে একে সব মিলিয়ে গত ২০-২৫ বছরে আমি ঘর হারিয়েছি কমপক্ষে ১৪ বার। এখন শেষ সম্বল নিজের বাড়ির ভিটাটুকুও আর নেই। তার পরও এই চরের মায়া আমাকে দূরে থাকতে দেয় না। বারবার ঘর তলিয়ে যায় বলে দুই ছেলে চর ছেড়ে শহরে গিয়ে বাড়ি করেছে। কিন্তু চর ছেড়ে যেতে আমার ভালো লাগে না। এই চরেই যে বাপ-দাদারা শুয়ে আছেন। আমরা তাঁদের রেখে কিভাবে যাব। চর ছেড়ে গেলে তাঁদের আত্মা কষ্ট পাবে। তাঁদের কষ্ট দিয়ে আমরা যেতে পারি না। ’ 

পদ্মার মাঝচরের আরেক বাসিন্দা জুলেখা বিবি। স্বামী-সন্তান নিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার তাঁর। জন্ম নেওয়ার পর থেকেই চরেই বসবাস। এই নারীর বয়স এখন প্রায় ৬০ বছর। জুলেখা অন্তত ১২ বার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এখন তিনি নিঃস্ব প্রায়। সংসারে স্বামী-সন্তান ছাড়া কিছুই নেই তাঁর। শুষ্ক মৌসুমে পরের জমিতে কাজ করে সংসার চালান জুলেখা। সঙ্গে স্বামী-সন্তানও কাজ করেন। তবু চরই যেন তাঁর শেষ ভরসা। হারানো ভিটামাটির নামমাত্র চিহ্ন ছেড়ে কোথাও যেতে চান না তিনি। চর পার হয়ে কিছু দূরেই রাজশাহী শহর; যেখানে প্রায় প্রতিদিন অনেকেই আশ্রয় খোঁজে, নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু চরের মায়া ছাড়তে নারাজ জুলেখা। তাই বারবার পদ্মার জলের তোড়ে শেষ সম্বলটি ডুবে গেলেও মনের জোর কখনো ডোবেনি তাঁর। সেই জোরেই এখনো টিকে আছেন দুর্গম পদ্মার চরে।

পদ্মার চরখিদিরপুরের বাসিন্দা হযরত আলী। তিনিও বাপ-দাদার আমল থেকে এই চরেই বসবাস করছেন। এরই মধ্যে পদ্মা তাঁর বাড়ি তলিয়ে নিয়েছে অন্তত ১৫ বার। কখনো কখনো সংসারের জিনিসপত্রও সামলাতে পারেননি হযরত আলী। সব পানির তোড়ে ভেসে গেছে। আবার দুর্গম এলাকার বাসিন্দা বলে ছয় ছেলেমেয়েকে না পেরেছেন লেখাপড়া করাতে, কর্মজীবী করে গড়ে তুলতে। চরখিদিরপুর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে শহরে গিয়ে নানা কাজ করে সংসার চালাতে পারতেন। কিন্তু বাপ-দাদার ভিটা যা এখন পদ্মার চর তা ছেড়ে যেতে চান না হযরত আলী।

রাজশাহীর চরের শুধু এই তিন পরিবারই নয়, নগরীর পাশের চরমাঝাড়দিয়াড়, চরখিদিরপুরসহ অন্যান্য চরের অন্তত ২৫ হাজার মানুষ চরকে আঁকড়ে ধরে বাস করছে। জীবনসংগ্রামী মানুষগুলো বারবার হারিয়েছে বাড়িঘর, আসবাব। তবু ভিটার মায়ায় শতকষ্টে পড়ে আছে চরের মাঝেই। বর্ষা মৌসুমে যখন চর ডুবে পানি থইথই করে, তখনো তারা সাহস হারায় না। মনের জোরে পানির মধ্যেই যেন জীবনের আশ্রয় খুঁজে পায়।   

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা পদ্মার চর। রাজশাহী নগরীর অদূরে গড়ে ওঠা চরগুলো যেমন চরতারানগর ও চরখিদিরপুর এরই মধ্যে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে চরখানপুরও। চরখানপুরে বিজিবির একটি বিওপি ক্যাম্পও পদ্মায় হারিয়ে গেছে। তার পরও সব মিলিয়ে রাজশাহী জেলায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার চর এলাকা রয়েছে। জেলার পবা, গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় চরগুলো রয়েছে। গোদাগাড়ীর চরআষাঢ়িয়াদহ, পবার চরখানপুর, চরখিদিরপুর, চরতারানগর, মাঝচার, বাঘারচর রাজাপুর ইউনিয়নের অবস্থান ভারতীয় সীমান্ত এলাকায়। এসব চরে সব মিলিয়ে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বাস করে।  

বাঘারচর রাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষায় পানি আর শুষ্ক মৌসুমে গরম ও চলাচলে ব্যাপক কষ্টে থাকতে হয় চরবাসীকে। বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের অন্তত নব্বই শতাংশই পায় না এখানকার মানুষ। এ কারণে অনেকেই চর ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাসবাস শুরু করেছে। কিন্তু এখনো হাজার হাজার মানুষ চরেই রয়ে গেছে শতকষ্ট বুকে চেপে। তারা চর ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না শুধু মাটির টানে। বাপ-দাদার ভিটার টানে। ’

স্থানীয় হরিয়ান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই ইউনিয়নে পদ্মার তিনটি চর রয়েছে। একসময় এসব চরের হাজার হাজার একর জমিতে চাষাবাদ হতো। চরের প্রায় সব মানুষই ছিল আত্মনির্ভরশীল। কিন্তু এখন তারা সবাই প্রায় নিঃস্ব। এর পরও চরের মায়া ছাড়তে পারে না তারা। ঘর ভাঙলে আবার নতুন করে ঘর গড়ে। জমি হারায়, কিন্তু নিজের মনোবল হারায় না তারা। ’

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের এমপি আয়েন উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্গম চর এলাকার বাসিন্দারা এখন অনেক কষ্টে জীবন যাপন করে। তাদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে আমি বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। কিছু কিছু এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অনেক কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এগুলো করতে পারলে কিছুটা হলেও উপকৃত হবে চরের অবহেলিত মানুষগুলো। ’


মন্তব্য