kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ট্রাইব্যুনালে কেঁদে কেঁদে বিচার চাইলেন বাবা

খোঁজ নেই অমিপ্রভার, হুমকির মধ্যেই বিচার শুরু

আশরাফ-উল-আলম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ট্রাইব্যুনালে কেঁদে কেঁদে বিচার চাইলেন বাবা

অপহরণের দুই বছর পরও এসএসসি পাস করা ছাত্রী অমিপ্রভা তালুকদারের খোঁজ মেলেনি। কিন্তু অপহরণ মামলাটিতে একে একে সব আসামি জামিন পেয়ে গেছে।

সর্বশেষ গত ২০ জুলাই হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় প্রধান আসামি। এখন মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি পাচ্ছেন অমিপ্রভার বাবা।

এই অবস্থায়ই গতকাল রবিবার থেকে নিম্ন আদালতে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। এ সময় কেঁদে কেঁদে মেয়েকে উদ্ধার এবং অপহরণের বিচার চেয়ে আদালতে আরজি জানান অমির বাবা অসীম কুমার তালুকদার।

সালিসে অমিপ্রভাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছিল আসামিরা। কিন্তু কথা না রাখায় ২০১৪ সালের জুনে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন তার বাবা। পরে আদালতের নির্দেশে রাজধানীর শেরে বাংলানগর থানার পুলিশ প্রধান আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণও পায়। পরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহায়তাও চান অমির বাবা। কমিশন এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে অনুরোধ করলেও অমিকে আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।

অমিপ্রভা অপহরণ মামলায় পুলিশ প্রধান দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও অমিপ্রভাকে উদ্ধার করতে পারেনি। অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। গ্রেপ্তারকৃত একজন এবং অন্য দুই আসামি আত্মসমর্পণ করে ট্রাইব্যুনাল থেকে জামিন পায় আগেই। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের পর অমিপ্রভার পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়াসহ নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হয় কয়েকবার। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ১৫ বছর বয়সী ছাত্রী অমিপ্রভাকে ২০১৪ সালের ১২ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশে বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ সরণি থেকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। অমিপ্রভার বাবা অসীম কুমার তালুকদার অরুপ রাজধানীর গ্রীন লাইফ হাসপাতালের একজন ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান। তাঁর স্ত্রী জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স।

দুই কন্যাসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের শেরে বাংলানগরের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকেন অসীম। মেয়ে অমিপ্রভা শেরে বাংলানগর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করার সময় ঢাকা কলেজের ছাত্র অনুপ চন্দ্র শীল তাকে উত্ত্যক্ত করত। অনুপ চন্দ্র শীল ও অমিপ্রভাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনায়। উত্ত্যক্ত করার এক পর্যায়ে অমিপ্রভাকে তাদের গ্রামের বাড়িতে বরগুনার স্থানীয় শেরেবাংলা সমবায় হাই স্কুলে পড়তে পাঠানো হয়। সেখানে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। দুই বছর সেখানে পড়াশোনা করার সময়ও অনুপ চন্দ্র শীল গ্রামের বাড়িতে গিয়ে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। এ নিয়ে এলাকায় সালিস-দরবার হয়। পরে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করার পর বাধ্য হয়ে অমিপ্রভাকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঘটনার দিন ছোট বোন আইসক্রিম খেতে চাইলে তা কেনার জন্য বাসা থেকে বের হয় অমিপ্রভা। ঢাকা শিশু হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথে এলেই একটি মাইক্রোবাস এসে থামে তার পাশে। অমিপ্রভাকে জোর করে টেনেহিঁচড়ে অনুপ চন্দ্র শীল ও তার বোনজামাই যুগল চন্দ্র শীল এবং তাদের কয়েকজন সহযোগী মাইক্রোবাসে তোলে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে অনুপ চন্দ্র শীলদের বাড়িতে গেলে তারা অমিপ্রভাকে অনুপের সঙ্গে বিয়ে দিতে বলে। অন্যথায় মেয়েকে পাওয়া যাবে না বলে জানায়।

এ ঘটনায় অমিপ্রভার বাবা অসীম কুমার তালুকদার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অনুপ চন্দ্র শীল, তার বাবা অনীল চন্দ্র শীল, বোনজামাই যুগল চন্দ্র শীল ও মা চানু রানী শীলের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৩ জুন একটি অপহরণ মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি তদন্ত করতে শেরে বাংলানগর থানাকে নির্দেশ দেন। শেরে বাংলানগর থানা বিষয়টি তদন্ত করে অমিপ্রভাকে আসামিরা অপহরণ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এ ছাড়া অমিপ্রভার বাবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহায়তাও চান।

এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামির বাবা অনীল চন্দ্র শীল ও মা চানু রানী শীলকে অব্যাহতি দিয়ে মামলার বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। দুই আসামি অনুপ চন্দ্র শীল ও যুগল চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

প্রধান আসামির জামিন : মামলার প্রধান আসামি অনুপ চন্দ্র শীলকে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন তাকে ট্রাইব্যুনাল জামিন না দিলেও গত ২০ জুলাই হাইকোর্ট তাকে জামিন দেন। হাইকোর্টের আদেশ থেকে দেখা যায়, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদের বেঞ্চ আসামিকে ছয় মাসের জন্য অন্তবর্তীকালীন জামিন দেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বাদীকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অমিপ্রভার বাবা অসীম কুমার তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়ে এখন কোথায়, কিভাবে আছে তা জানি না। আদৌ বেঁচে আছে, নাকি মেরে ফেলা হয়েছে, নাকি পাচার করা হয়েছে, তা অপহরণকারীরা আর ভগবান ছাড়া কেউ জানে না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি মেয়েকে ফিরে পাব কিনা জানি না। এ অবস্থায় প্রধান আসামি জামিন পেয়ে মোবাইল ফোনে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। ’ তিনি ও তাঁর পরিবার এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জানান।

ট্রাইব্যুনালে কাঁদলেন বাবা : অমিপ্রভার বাবা অসীম কুমার তালুকদারের সাক্ষ্য নেওয়ার মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার মামলার মূল বিচারকাজ শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেওয়ার সময় অসীম কুমার কেঁদে ফেলেন। তিনি তাঁর মেয়েকে অপহরণের বিচার চান।

জবানবন্দিতে অসীম কুমার বলেন, তাঁর মেয়েকে বিভিন্ন সময়ে উত্ত্যক্ত করত প্রধান আসামি অনুপ চন্দ্র শীল। এ নিয়ে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে সালিসও হয়। কিন্তু প্রধান আসামিকে কোনোভাবেই থামানো যায়নি।

বাদী বলেন, অনুপ ও তার ভগ্নিপতিসহ কয়েকজন সস্ত্রাসী তাঁর মেয়েকে টেনেহিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে শুনেই তিনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলা করার আগে আসামিদের আত্মীয়স্বজন ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বাদীর মেয়েকে ২০১৪ সালের ২ জুনের মধ্যে ফেরত দেবে বলে জানিয়েছিল। ফেরত না দেওয়ায় ৩ জুন মামলা করেন।

বাদীর জবানবন্দি দেওয়া শেষ হলে আসামিপক্ষ তাঁকে জেরা করার জন্য সময় চায়। বিচারক সময় মঞ্জুর করে পরবর্তী ধার্য তারিখে বাদীকে হাজির থাকতে বলেন। গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পরবর্তী তারিখ জানা যায়নি। বাদীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন বিশেষ পিপি ফোরকান মিয়া। তাঁকে সহযোগিতা করেন বাদীর ব্যক্তিগত আইনজীবী সেঁজুতি ঘোষ।


মন্তব্য