kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

বেড়ানো

মুক্তমনে কাশবনে

তৌফিক মারুফ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তমনে কাশবনে

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাশবন এখন নগরবাসীর বড় বিনোদনকেন্দ্র। ছবি : শেখ হাসান

বেজে উঠেছে ট্রেনের হুইসেল আর কাশবনের ভেতর দিয়ে ছুটছে অপু-দুর্গা। ওরা ট্রেন দেখবে বলে কাশফুল মাড়িয়ে পৌঁছেছিল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে দৃষ্টি থেকে বেরিয়ে গেছে ট্রেনটি।

অপু-দুর্গার সামনে তখন ট্রেনের শেষ অংশ আর স্টিম ইঞ্জিনের ছেড়ে যাওয়া ধোঁয়ার রেখা। পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যকাব্য কার না মনে আছে। এ তো গেল সেদিনের কাশবন মাড়িয়ে ট্রেন দেখার গল্প।

কিন্তু এখন যান্ত্রিক নগরজীবন। বলতে গেলে ‘ট্রেন মাড়িয়ে’ কাশবন দেখার আকাঙ্ক্ষা সবার। ঠিক তাই হাঁপিয়ে ওঠা জীবনের জন্য তো চাই মুক্ত বাতাস, মুক্ত প্রান্তর। বনে-বাদাড়ে একটুখানি বিচরণ। ঘুরে বেড়াতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু বাড়ির কাছে দুপা ফেলে সেই শিশিরবিন্দু কই? তবুও দেখা যাক দুচোখ মেলে...

রাজধানীর উত্তর-পূর্ব প্রান্তের বিশ্বরোড-পূর্বাচলমুখী ৩০০ ফুট সড়ক এবং এর আশপাশের বিস্তৃত খোলামেলা মুক্তাঞ্চল। বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ প্রতিদিন বিকেলে ভিড় জমায় এই পথ ধরে। কেউ হেঁটে বেড়ায়, কেউ বা ঘোরে গাড়িতে চড়ে। আবার কেউ আপনজন সঙ্গে নিয়ে কোথাও বসে যায় নিরিবিলি আড্ডা-গল্পে।

কেবল ৩০০ ফুট সড়ক বা পূর্বাচলই নয়, এর সঙ্গে নতুন আরেক প্রাণস্পর্শী মনোরম দৃশ্য ছুঁয়ে যায় শ্বেতশুভ্র কাশবনের উড়ু উড়ু দোলায়। শরতের শুভ্রতার প্রতীক হয়ে থাকা কাশফুলে চোখ আটকে যায় দূর থেকে দূরে। যার অনেকটা জুড়ে আছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিশাল প্রান্তর। পূর্বাচল ও বসুন্ধরা ছাড়াও রামপুরা সংলগ্ন আফতাবনগর, মিরপুর, বসিলাসহ আরো কিছু এলাকায় দেখা মেলে কাশবনের। এ ছাড়া তুরাগ তীরের অনেক স্থানেই কাশবন রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’র মতোই বসুন্ধরা-পূর্বাচলের পেট ফুঁড়ে চলে যাওয়া ছোট বালু নদীর ধারে ‘... একাধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা...’ লাইনটাকে মনে করিয়ে দেয় সহজেই। যদিও বালু নদীর দুই ধারেই এখন ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। সেই সঙ্গে পূর্বাচলের দীর্ঘ ও সুপরিসর খোলা ৩০০ ফুট সড়ক আর বসুন্ধরা একই এলাকা হওয়ায় অন্য এলাকার চেয়ে ভ্রমণপিপাসুদের নজর এখন বেশি পড়েছে এদিকটাতেই।

প্রতিদিন দুপুরের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষ ছুটে আসে পূর্বাচল ও বসুন্ধরায় কাশফুলের ছোঁয়া পেতে। তারা ঘুরে বেড়ায় কাশবনের এ-পথ থেকে ও-পথে। হাতে ধরে কিংবা গায়ে জড়িয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সবাই। কেউ বা ফিরে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যায় কাশগুচ্ছ। বছরখানেক বিভিন্ন মাধ্যম হয়ে এ কাশবনের খবর এখন ছড়িয়ে গেছে বহুজনে। তবে এবার কোরবানি ঈদের ছুটিতে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাশবনে ভিড় বেড়ে গেছে অনেকটাই। আবার কাশবনও হয়েছে অনেক ঘন-গভীর। অনেকেই খোঁজ নেয় কাশবনে আসা-যাওয়ার পথ জানতে। বসুন্ধরা-পূর্বাচলের অবারিত সাদা কাশফুলের সমাহারের টানে ঘুরতে আসতে চায় তারা।

গতকাল শনিবার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসুন্ধরার কাশবনে বেড়াতে আসেন পুরান ঢাকার রাইসুল ইসলাম। ফেরার পথে তাঁর দুই সন্তান আর স্ত্রীর হাতে দেখা যায় কাশের গুচ্ছ।

জানতে চাইলে রাইসুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব সময়ই কাশবন আমাকে খুব টানে। গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর যান্ত্রিকতায় আটকে গিয়ে বহু দিন আর কাশ দেখা হয়নি কাছ থেকে। এক বন্ধুর মাধ্যমে শুনেছি এখানে কাশবনের কথা। এরপর থেকেই আগ্রহ জাগে এখানে আসার। কিন্তু সময় পাচ্ছিলাম না। এবার ঈদের আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, আর কোথাও বেড়াতে যাই না যাই কাশবনে আসবই। ছুটিও পেলাম ভালোই। তাই ঈদের পরদিন একবার এসে একা দেখে গেছি। আজ পরিবার-পরিজন নিয়ে এলাম। ওরা জীবনে এই প্রথম এত কাছ থেকে কাশবন দেখল, হাতে ছুঁতে পারল। অনেক ছবিও তুললাম। এটা আমাদের কাছে বড় এক আনন্দ হয়ে থাকবে। ’

খিলগাঁও থেকে আসা দম্পতি রায়হান ও সুহানা মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন কাশবন দেখতে। সুহানা নিজের মাথায় কাশফুল গুঁজে ঘুরে বেড়ান অনেকক্ষণ।

সুহানা বলেন, ‘অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি, অনেক ভালো ভালো পার্কে গেছি। কিন্তু কাশবন যে এতটাই প্রাণ ছুঁয়ে যায়, সেই অনুভূতি আগে কখনো পাইনি। এটি সত্যিই প্রাণের সঙ্গে প্রকৃতির এক অন্য রকম বন্ধন তৈরি করে দিল। ’

মা-বাবার সঙ্গে আসা ছোট শিশু রায়েনা উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এই কাশফুলগুলো বাসায় নিয়ে পড়ার টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখব। ’

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই পূর্বাচলের আশপাশের কাশবনে চলে নাটক-সিনেমার শুটিং। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার ফটোসাংবাদিকরাও ছবি তুলে নেন। বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনের মডেলদের আনাগোনাও চলে প্রতিদিন। অবশ্য নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রেখে অবাধ প্রবেশে অনেকটা সতর্ক থাকেন বসুন্ধরা বা পূর্বাচলে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীরা। তাদের পড়তে হয় জিজ্ঞাসাবাদ বা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তল্লাশির মুখে।


মন্তব্য