kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্রিটেনে বাংলাদেশি ইমাম খুনে যুবকের যাবজ্জীবন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ব্রিটেনে বাংলাদেশি ইমাম খুনে যুবকের যাবজ্জীবন

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশি ইমাম জালাল উদ্দিনকে হত্যার দায়ে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সমর্থক এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত যুবকের নাম মোহাম্মেদ হোসেন সাঈদী (২১)।

গত শুক্রবার ম্যানচেস্টার ক্রাউন কোর্ট এই রায় ঘোষণা করেন।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ম্যানচেস্টারের রচডেলের একটি শিশু পার্কে ইমাম জালাল উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। তাঁর মাথায় ও মুখে জখমের চিহ্ন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আদালতে এটিকে আইএস আদর্শে অনুপ্রাণিত একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বিচারে মোহাম্মেদ সাঈদীর বিরুদ্ধে ইমাম হত্যায় সহযোগিতা করার প্রমাণ মিলেছে। তাকে শাস্তি হিসেবে কমপক্ষে ২৪ বছর কারাভোগ করতে হবে। আদালতে রায় ঘোষণাকালে মোহাম্মেদ সাঈদী আদালতে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। এ সময় পাবলিক গ্যালারিতে বসা তার পরিবারের সদস্যদের বিমর্ষ ও ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা যায়। তখন তিন সপ্তাহের বিচার কার্যক্রম দেখতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নিহত জালাল উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে এবং কান্নাকাটি করে।

রোগ নিরাময়সহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে রুকিয়া নামে ইসলামী আধ্যাত্মিক চিকিৎসা ও তাবিজ চর্চার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে আদালতের রায়ে উঠে এসেছে, যা আইএসের দৃষ্টিতে ইসলামবিরুদ্ধ ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ (তন্ত্রমন্ত্র) হিসেবে বিবেচিত।

আদালতে বলা হয়, ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নামাজ আদায়ের পর মসজিদ থেকে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খেয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন ইমাম। পথে শিশু পার্কে তাঁর ওপর হামলা করা হয়। প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে রচডেলে গিয়ে বসবাস শুরু করেন ইমাম জালাল উদ্দিন। তিনি রোগ ও অশুভ শক্তি তাড়াতে মানুষকে ইসলামী পন্থায় তাবিজ দিতেন। এর মাধ্যমে এলাকায় বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু এ ধরনের ইসলামী ‘চিকিৎসা পদ্ধতি’র প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে তাঁর ওপর হামলা হয় বলে আদালতকে জানায় প্রসিকিউশন।

আদালতে বলা হয়, মোহাম্মেদ হোসেন সাঈদী (২১) ও আব্দুল কাদির (২৪) ইমামের ওপর হামলা চালায়। হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে তুরস্কে চলে যায় কাদির। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে সে সিরিয়ায় রয়েছে।

নিহত জালাল উদ্দিনের পারিবারিক বন্ধু হারাস রফিক বিবিসিকে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, যুক্তরাজ্য এবং পুরো পৃথিবীতে এ মুহূর্তে ইসলামের ভেতরেই যেন একটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যারা আধ্যাত্মিক পন্থায় তাবিজের মাধ্যমে মানুষের রোগ সারায়, তাদের একশ্রেণির মানুষ অপছন্দ করতে শুরু করেছে। এদের তারা প্রকৃত মুসলিম বলে মনে করছে না। ’

আদালতে প্রসিকিউটর বলেন, ‘জালাল উদ্দিন রোগ সারাতে যে ইসলামী পন্থা চর্চা করতেন আইএস সেটাকে ব্ল্যাক ম্যাজিক হিসেবে দেখে এবং তারা মনে করে, যারা এর চর্চা করে তাদের কঠিন শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য। ’

আদালতে শুনানিকালে প্রসিকিউটর পল গ্রিনি কিউসি বলেন, হামলার আগে সাঈদী গাড়িতে করে কাদিরকে ওই পার্কের ফটকে নিয়ে যায়। কাদির বারবার ইমামের মুখে সজোরে আঘাত করে। তারপর সে পার্কের অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে সাঈদীর গাড়িতে উঠে পালিয়ে যায়। পরে দুই কিশোরী রাত পৌনে ৯টার দিকে অচেতন অবস্থায় জালাল উদ্দিনকে দেখতে পায়। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে কিছুক্ষণ পরই তাঁর মৃত্যু হয়।

আদালতের বিচারক ডেভিড ম্যাডিসন বলেন, হত্যাকাণ্ডে জালাল উদ্দিনের ভূমিকা ‘একেবারেই অবিচ্ছেদ্য’। বিচারক বলেন, জালাল উদ্দিনকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন না। তবে ইমাম যাতে আর তাবিজ দিতে না পারেন সেজন্য ‘তাঁর গুরুতর ও স্থায়ীভাবে শারীরিক ক্ষতি’ করতে এই হামলা হয়।

নিহত ইমাম জালাল উদ্দিনকে বিনয়ী, শ্রদ্ধেয় হিসেবে উল্লেখ করে বিচারক ম্যাডিসন বলেন, এই বর্বর হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ (হেট ক্রাইম)। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, দুজন মুসলিম অপর একজন মুসলিমকে হত্যা করেছে, শুধু তাঁর বিশেষ ধর্মচর্চাকে মানতে না পারার কারণে। ’

নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে জালাল উদ্দিনের সাত ছেলের একজন সালা আল-আরিফের একটি বিবৃতি আদালতে পড়া হয়। তিনি বলেন, ১৫ বছর আগে যুক্তরাজ্যে আসার পর এ বছরের শেষদিকে প্রথমবারের মতো স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের দেখতে দেশে যেতে চেয়েছিলেন তাঁর বাবা। বাবাকে ‘একজন ধর্মপ্রাণ শান্তিকামী মানুষ, যিনি কারো প্রতি ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু দেখাননি’ হিসেবে বর্ণনা করে তাঁকে কেন হত্যা করা হলো সেই প্রশ্নের জবাব চান আরিফ।

অনুসারীদের কাছে ‘কারি সাব’ নামে পরিচিত জালাল উদ্দিনকে সাঈদী ও তার বন্ধু কাদির ‘ম্যাজিশিয়ান’ হিসেবে বিবেচনা করে। হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস আগে তারা মসজিদ থেকে জালাল উদ্দিনের তাবিজসংক্রান্ত নথিপত্র ও বই নিয়ে ধ্বংস করে।

ঘটনার পাঁচ দিন পর গোয়েন্দারা সাঈদীকে তার রচডেলের বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর তার মোবাইল ফোনে জালাল উদ্দিনের মৃত্যুদৃশ্য পান। এ সময় তার বাসা থেকে আইএসের প্রচারের অনেক কিছু উদ্ধার করা হয়। তবে কাদির নিজেকে আইএস সমর্থক বলে স্বীকার করলেও ইমাম হত্যায় সে সম্পৃক্ত নয় বলে দাবি করে। যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই ছাত্র তাবিজের ব্যবহার নিয়ে নিজের আপত্তির কথাও আদালতে তুলে ধরে। সূত্র : গার্ডিয়ান ও বিবিসি।


মন্তব্য