kalerkantho


আইএসের যৌনদাসী থেকে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আইএসের যৌনদাসী থেকে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত

নাদিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিজের জীবনকাহিনী শোনান। ছবি : রয়টার্স অনলাইন

ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের যৌনদাসী হিসেবে দিনের পর দিন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সইতে হয়েছে আরো নানা অকথ্য অত্যাচার। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিও শুকিয়ে গিয়েছিল একসময়। কিন্তু শরীর আর মনের নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যেও বারবার ভেবেছিলেন একটা কথাই, ‘এখান থেকে পালাতে হবে। পালাতেই হবে। ’ চরম ঝুঁকি নিয়ে সেই ‘নরক’ থেকে বেরিয়ে আসা নাদিয়া মুরাদই আজ জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত।

গত বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিজের ‘পুনরুজ্জীবনের’ কাহিনী শুনিয়েছেন নাদিয়া। শিউরে ওঠার মতো সেই কাহিনী। ইরাকের কুর্দি জনগোষ্ঠীর ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মেয়ে নাদিয়া মুরাদ। ২০১৪ সালে ইরাক যখন আইএসের দখলে একটু একটু চলে যাচ্ছিল তখন নাদিয়া ১৯ বছরের তরুণী। আইএসের তখন তাণ্ডব চলছে ইরাকের নানা অংশজুড়ে।

দুর্ভাগ্যবশত তেমনই এক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল নাদিয়ার পরিবার। মা, বাবা ও ছয় ভাইয়ের সঙ্গে দিব্যি কাটছিল তাঁর সুখের দিন। কিন্তু আইএসের নারকীয় তাণ্ডব ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যায় তাঁর সেই সুখের দিন। তখন চারদিকে ইয়াজিদি নারীদের জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আইএসের লোকেরা। নাদিয়াও বাদ গেলেন না। যে পাঁচ হাজার নারীকে অপহরণ করেছিল আইএস, তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।

নাদিয়া বর্ণনা দেন, একদিন আইএস জঙ্গিরা গ্রামে এসে ঢোকে। ইয়াজিদিদের তারা ইসলামে ধর্মান্তরিত করা শুরু করে। যারা বিরোধিতা করেছিল, মুখে কালাশনিকভের নল ঢুকিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছিল তাদের। ইয়াজিদি মেয়েরা ভয়ে গ্রামেরই একটি স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। তাদের টেনে টেনে বের করে তুলে নিয়ে যায় জঙ্গিরা।

শুরু হয় এক দীর্ঘ ও ভয়ংকর বাসযাত্রা। ঠাসাঠাসি বাসে তখন ইয়াজিদি মেয়েদের আর্তচিৎকার। নাদিয়ার কথায়, এই দেখে জঙ্গিরা জোরে জোরে হাসছিল আর বলছিল, ‘এখন তোরা আইএসের। তোদের বিয়ে করা হবে। ’ বাসে যেতেই যেতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল যৌন নির্যাতন। যেদিন তাঁকে অপহরণ করা হয়, মা-বাবা ও ভাইয়েরা প্রতিরোধ করতে গিয়েছিলেন। চোখের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাঁদের। ওই দিনই গ্রামের আরো ৩০০ পুরুষকে খুন করে আইএসের লোকেরা।

নাদিয়ার কথায়, যারা ইয়াজিদি নারীদের যৌনদাসী বানিয়ে ধর্ষণ করত, তাদের স্ত্রীরাও জানত গোটা বিষয়। আর এটাকে মেনেও নিত তারা।

তিন মাসের বেশি বন্দি ছিলেন নাদিয়া। এই তিন মাসে কতবার ধর্ষিত হয়েছেন, কতবার তাঁকে মারধর করা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। নাদিয়া বলেন, ‘একেক সময় মনে হতো আত্মহত্যা করি। এই অত্যাচার সহ্য করা যায় না। পরক্ষণেই মনে হতো, না, মরব না। বেঁচে থাকব এবং এখান থেকে পালাব। ’

পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে কয়েকবার গলা উঁচিয়েছিলেন নাদিয়া। কিন্তু তার পরিণতি আরো ভয়ংকর হলো। ছোট অন্ধকার কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। বন্ধ করে দেওয়া হলো খাবার। তবে মারধর আর ধর্ষণ কিন্তু থেমে থাকেনি। থেমে থাকেননি নাদিয়াও। প্রতি মুহূর্তেই তিনি ছক কষেছেন কিভাবে পালানো যায়। প্রথমবার পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। তারপর ছয়জন মিলে ধর্ষণ করতে থাকে নাদিয়াকে, একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত পালাতে পারেন নাদিয়া। আগস্টে অপহৃত হয়েছিলেন। পালাতে পারলেন নভেম্বরে। পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় পান এক জার্মান শরণার্থী শিবিরে। চিকিৎসা শুরু হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন শারীরিকভাবে। কিন্তু মানসিক অবস্থা পৌঁছেছিল একেবারে তলানিতে। এই অবস্থা থেকে তাঁকে আলোর পথ দেখান আমল ক্লুনি নামের এক নারী আইনজীবী। ক্লুনি একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী। নাদিয়ার মতো আরো অনেক নারী যারা আইএসের হাতে নির্যাতিত হয়েছে, তাদের পরিস্থিতি জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে একটি মামলা করে।

এখন নাদিয়াও কাজ শুরু করেছেন তাঁরই মতো অত্যাচারিত, নির্যাতিত নারী ও শিশুদের নিয়ে। আর সেই কাজের জন্যই নাদিয়া মুরাদকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শুভেচ্ছাদূত করল জাতিসংঘ। সূত্র : আনন্দবাজার।


মন্তব্য