kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সরকারি সংস্থাই আইন মানে না

আরিফুর রহমান   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি সংস্থাই আইন মানে না

নরসিংদীর ঘোড়াশালে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে ১৯৭২ সালে ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেডের যাত্রা শুরু। ৪৪ বছর পেরিয়ে গেছে, এখনো সেখানে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করেনি কর্তৃপক্ষ।

পাশের পলাশ সার কারখানায়ও ইটিপি নেই। ১৯৮৫ সালে এটি স্থাপন করা হয়।

সরকারি এই দুই সার কারখানা থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য বের হয় তার সবই সরাসরি গিয়ে পড়ে শীতলক্ষ্যায়। কারখানার তরল বর্জ্যে দূষিত হয়েই চলেছে নদীর পানি। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২০ আগস্ট কারখানা দুটি পরিদর্শনে যায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইটিপি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও কারখানা দুটিতে তা বসানো হয়নি।

গত সপ্তাহে কারখানাগুলোর জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে বলেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ঘোড়াশাল ও পলাশ সার কারখানার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। দুটি কারখানাই লাল শ্রেণিভুক্ত। অর্থাৎ এগুলো সবচেয়ে বেশি পরিবেশদূষণ করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, শিল্প-কারখানার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। আর ছাড়পত্র পেতে হলে ইটিপি বসাতেই হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিসিআইসির কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবেশ আইন প্রণয়নের অনেক আগে সার কারখানা দুটি হয়েছে। তখন পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে এখন যেহেতু আইন আছে, অতএব পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, পলাশ ও ঘোড়াশাল সার কারখানা পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে। অবশ্য এগুলো পরিবেশ আইন প্রণয়নের অনেক আগে হয়েছে। তখন ছাড়পত্র নিতে হয়নি। তবে এখন আইন অনুযায়ী তাদের এ ছাড়পত্র নিতে হবে। ছাড়পত্র নিতে বিসিআইসিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

আলমগীর হোসেন বলেন, শুধু বিসিআইসির আওতাধীন সার কারখানা নয়, আরো অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এখনো পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়নি; ইটিপিও বসায়নি। তাদের ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে, ইটিপি বসাতেও বলা হয়েছে।

আইন হওয়ার পর ২০ বছরেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়নি—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এত দিন মৌখিকভাবে ও চিঠি দিয়ে বলেছি। জরিমানাও করেছি। আগামীতে আমরা আরো কঠোর হব। ’

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, বেসরকারি শিল্প-কারখানা নদীদূষণ করছে, পরিবেশের ক্ষতি করছে। পাল্লা দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিবেশ ও নদীর ক্ষতি করছে।

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোই আইন মানছে না। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলছে তারা। বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থার তালিকা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, কর্ণফুলী পেপার মিলস, চন্দ্রঘোনা ও খুলনা পেপার মিলস এবং ঘোড়াশাল ও পলাশসহ বিসিআইসির অধিকাংশ সার কারখানা।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, এসব কারখানার তরল বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। ফলে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সরকারি সংস্থাগুলো আইন না মানার কারণে বেসরকারি শিল্প-কারখানার মালিকরাও সুযোগ নিচ্ছেন। তাঁদের চাপ দেওয়া যাচ্ছে না। সরকারি হাসপাতাল ও বিদ্যুেকন্দ্রগুলোও পরিবেশ আইন মানছে না বলে জানান তাঁরা।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিসিআইসির আওতাধীন কর্ণফুলী পেপার মিলস উৎপাদনে আসে ১৯৫৩ সালে। এটিতে এখনো ইটিপি বসানো হয়নি। অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। দূষণে নদীর পানি রং বদলাতে শুরু করেছে। উত্কট গন্ধ ছড়াচ্ছে। দূষণের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো ইটিপি বসায়নি চট্টগ্রামের পতেঙ্গার টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড। সুনামগঞ্জের ছাতক সিমেন্ট কম্পানির পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। হাটহাজারীর ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্ট ও দোহাজারীর ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্টের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এ দুটি কেন্দ্র লাল শ্রেণিভুক্ত। এগুলোর কারণে দূষিত হচ্ছে হালদা ও সাঙ্গু নদী। এগুলোতে তেল সরবরাহের সময় ওই দুই নদীতে তেল পড়ে দূষণ ঘটাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।


মন্তব্য