kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাবের হোসেন চৌধুরীর প্রতিবেদন

সৌদিতে যৌন নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকরা

আবুল কাশেম   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সৌদিতে যৌন নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকরা

গিয়েই যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তাই অনেক দেশই সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিক পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ কারণেই পুরুষ শ্রমিকদের ব্যাপারে আগ্রহ না থাকলেও বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে সৌদি সরকার।

কিছু গৃহকর্মী সেখানে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাঁদের বাংলাদেশ মিশন সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ধরনের কিছু নির্যাতিত নারী যখন বাংলাদেশে ফিরে আসছেন, তখন তাঁদের কোনো ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে কি না তা জানা নেই। যাঁরা এভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের জন্য আমরা কি কোনো ‘সাপোর্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবতে পারি?

সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের এমন বর্ণনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ও ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইপিইউর প্রেসিডেন্ট হিসেবে সৌদি আরব সফর শেষে সেখানে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের নির্যাতিত হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও জানিয়েছেন তিনি। পরে বেশ কিছু সুপারিশসহ সৌদি সফরের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের কাছেও একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী।

এর আগে সৌদি ফেরত অনেক নারীকর্মী নির্যাতনের কথা বললেও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে সে ব্যাপারে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আইপিইউর সভাপতি হিসেবে এবার সাবের হোসেন চৌধুরীও একই কথা বললেন।

গত ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের কাছে পাঠানো সৌদি সফর-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা অনেক। সৌদিতে নিরাপদ কর্ম সুবিধা পেতে শ্রমিকরা নিজেদের সহায় সম্বল বিক্রি করে যে পরিমাণ টাকা দালালদের দেয়, সে অনুপাতে শ্রমিকদের আয় বিবেচনা করলে তার কোনো মানেই হয় না। এত টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যাওয়ার চেয়ে তা দেশেই বিনিয়োগ করে এখানেই থেকে যাওয়া ভালো মনে হয়। ’

‘দালালদের এই দৌরাত্ম্য কমাতে হলে চাকরির সুবিধার তথ্য জানার পদ্ধতি অনেক সহজ করতে হবে। সৌদিতে থাকা আমাদের মিশন যদি সেখানে চাকরির বিজ্ঞাপনগুলো তাদের ওয়েবসাইটে দিয়ে তা এমনভাবে লিংক করে যাতে বাংলাদেশের বিডিজবসডটকমের মতো ওয়েবসাইটগুলোতে পাওয়া যায়, তাতে বাংলাদেশি চাকরি প্রত্যাশীরা খুব সহজেই তা দেখতে পাবে। অন্যদিকে আমরা দালালদের বিপুল অর্থ নেওয়া কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারি। সৌদি আরবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তারা প্রশিক্ষিত নয়। যে কাজের জন্য নেওয়া হচ্ছে, তা করার যোগ্যও নয়’—সাবের হোসেন চৌধুরী তাঁর দেওয়া প্রতিবেদনে এমনটিই উল্লেখ করেছেন।

সফরকালে আইপিইউ সভাপতি হিসেবে সাবের হোসেন চৌধুরী সৌদি আরবের প্রভাবশালী শুরা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গেও বাংলাদেশের জনশক্তি নিয়োগ, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কসহ জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী জোটে বাংলাদেশের সমর্থনের প্রশংসা করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সামরিক খাতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।

সৌদিতে বিনিয়োগ সুবিধা ও দেশটির রাজপরিবারে তরুণ নেতৃত্বের কর্তৃত্ব বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, সৌদি সমাজ ও দেশটির অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এমনকি সৌদি রাজপরিবারের মধ্যেও দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। রাজপরিবারে তরুণ, শিক্ষিত ও মার্জিত নেতৃত্ব আসছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ বয়ে আনতে পারে।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দর পতনের ফলে যদিও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন কিছুটা ধীরগতির। দেশটিতে নতুন ভবন নির্মাণ ও প্রকৌশল খাতের প্রকল্প এবং বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা বাণিজ্যে বিলিয়ন ডলার লেনদেন হচ্ছে। পাকিস্তানি ও ভারতীয় কম্পানিগুলো এসব খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছে। এখনো বাংলাদেশি কম্পানিগুলোর এসব খাতে বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। সৌদিতে বাংলাদেশি কম্পানি এসব খাতে বিনিয়োগ করলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে সৌদি সরকারের নেওয়া শ্রমিকের অতিরিক্ত শ্রমিক ওই সব প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়ার নিশ্চয়তাও পাওয়া যাবে। এ ছাড়া সরকারের মালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোও সৌদি আরবে লাইসেন্স নিতে পারে। এ বিষয়ে শুরা কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্য সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

সাবের হোসেন বলেছেন, ব্যাংকিং কার্যক্রমের পাশাপাশি তারা লাভজনক এক্সচেঞ্জ হাউসের ব্যবসাও করতে পারবে। সৌদি আরবে এই মুহূর্তে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছে। তারা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে।

দেশে ফেরত আসার সময় রিয়াদ বিমানবন্দরে সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে শুরা কাউন্সিলের সদস্য এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের মতো সৌদি সরকারের প্রতিষ্ঠান ‘সৌদি এরাবিয়ান জেনারেল ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির (সাগিয়া) গভর্নর ও চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ লতিফ আল-ওথম্যানের সাক্ষাৎ হয়। তিনি সাবের হোসেনকে জানান, সৌদি সরকার তাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগের দরজা উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। এমনকি রিটেইল খাতে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা হবে। এসব খাতে বিনিয়োগে বাংলাদেশি কম্পানিগুলোকে উৎসাহিত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।


মন্তব্য