kalerkantho


আজিমপুরে নিহত জঙ্গি গাইবান্ধার তানভীর কাদেরী

‘পুরো পরিবারই জঙ্গি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আজিমপুরে নিহত জঙ্গি গাইবান্ধার তানভীর কাদেরী

রাজধানীর আজিমপুরে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে নারী জঙ্গিদের আস্তায় পুলিশের অভিযানের সময় নিহত জঙ্গি জামশেদ ওরফে শমসেদ ওরফে তানভীর কাদেরী ওরফে শিপারের (৩৯) বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের পশ্চিম বাটিকামাড়ি গ্রামে। তাঁর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল বাতেন কাদেরী। ওই দিনের ঘটনায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ কাজে পেছন থেকে সহযোগিতা করার অভিযোগে মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নেসা শিলাকে খুঁজছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। তাতে আবদুল করিম নামের ব্যক্তিটি শমসেদ বলে জানা যায়। বাড়িভাড়া নেওয়ার জন্য ওই পরিচয়পত্রটি জমা দেওয়া হয়। পরে দেখা গেছে সেটি ভুয়া। রাজশাহীর বোয়ালিয়ায় শমসেদ নামে কাউকে পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি গাইবান্ধার বাসিন্দা তানভীর কাদেরী।  

গত রবিবার রাতে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) এসআই দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে লালবাগ থানার একটি মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন অভিযানের সময় মৃত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ‘নিউ জেএমবির সক্রিয় সদস্য’ তানভীর কাদেরী ওরফে শমসেদ ওরফে আবদুল করিম, তাঁর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা, তাঁদের ছেলে তাহরীন কাদির রাসেল, আফরিন ওরফে প্রিয়তী ও শায়লা আফরিন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, পুলিশ ওই জঙ্গি আস্তানার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাহরীম কাদেরী ওরফে রাসেলও পুলিশের ওপর ছুরি হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে পুলিশ তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। মামলায় আরো বলা হয়, বাসার ভেতরে ঢোকার পর একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় সোয়াত টিমকে খবর দেওয়া হয়। সোয়াত টিমের সদস্যরা ওই কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং আট বছর বয়সী জুনায়ারা ওরফে পিংকি এবং এক বছর বয়সী সাবিহা জামান নামে দুই শিশুকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠান।

সিটিটিসি ইউনিটের উপকমিশনার মহিবুল হক বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তাহরীন কাদেরী নামের এক ১২-১৩ কিশোরকেও উদ্ধার করা হয়। গত সোমবার ওই কিশোরকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের হেফাজতে নেওয়া আবেদন করে পুলিশ।

আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, নিহত তানভীর ওরফে শিপারের ‘মা’ সুরাইয়া নার্গিস কাদেরী। বাতেন কাদেরীর দুই মেয়ে এক ছেলের মধ্যে তানভীর সবার ছোট। গাইবান্ধা সরকারি বালক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সালে এসএসসি এবং ’৯৬ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা কলেজ থেকে অনার্সে মাস্টার্স করে। চলতি বছরের এপ্রিলের শেষদিকে তানভীর পরিবারকে জানায়, ভালো চাকরির আশায় সে মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছে। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না বলে দাবি করেন বাবা বাতেন কাদেরী।

বৃহস্পতিবার তানভীরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে সুনসান নীরবতা। সাংবাদিকের উপস্থিতি জানতে পেরে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে ভিড় জমায়। এলাকাবাসী দাবি করে, তানভীরকে তারা ভালো মানুষ হিসেবে জানত।

সহপাঠী ও পুলিশ সূত্র থেকে জানা গেছে, নিহত শিপারের দাদা পাকিস্তানের নাগরিক। দেশটির পেশোয়ার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে এসে গাইবান্ধায় বসবাস শুরু করেন। এরপর এখানেই বিয়ে করে স্থায়ী বাসিন্দা হন। ২০১৪ সালে সপরিবারে হজ করে আসার পর বাবা-মাসহ অন্যরা শিপারের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রতা লক্ষ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হলে তানভীর বলত, এ দেশে সঠিকভাবে ধর্ম মানা হয় না।

সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মেহেদি হাসান জানান, ঢাকার ঘটনার পর তানভীরের বাবা বাতেন কাদরী, বোন তানজিলা কাদরী ও ভগ্নিপতি জিয়াউল হককে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখনই পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।

আটককৃতরা বড় নেটওয়ার্কের সদস্য :  সিটিটিসি সূত্র জানায়, আহত তিন নারীকে চিকিৎসা চলাকালে সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এতে পাওয়া কিছু তথ্য যাচাই করতে চাইছেন তদন্তকারীরা। আহত নারীরা হলেন নব্য ধারা জেএমবির শীর্ষ নেতা নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তী (২৫), নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরী ওরফে আবদুল করিমের স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা (৩৫) এবং আরেক জঙ্গি নেতা জামান ওরফে বাসারুজ্জামানের স্ত্রী শায়লা আফরিন (২৩)। জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের ঘটনায় লালবাগ থানায় দায়ের করা মামলায় এই তিন নারী জঙ্গির নাম স্বামীর নামের পাশাপাশি উল্লেখ করা হলেও তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা নেই।


মন্তব্য