kalerkantho


সেই এমপিপুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ব্যবসায়ীর বাড়ি গাড়ি দখলের চেষ্টা

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ব্যবসায়ীর বাড়ি গাড়ি দখলের চেষ্টা

রাশেদ সরোয়ার রুমন

সাতক্ষীরায় এক ব্যবসায়ীর বাড়ি ভাঙচুর করে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের মালপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রিফাত আমিনের ছেলে রাশেদ সরোয়ার রুমনের বিরুদ্ধে। ওই ব্যবসায়ীর পরিবার ও স্থানীয় লোকজন জানায়, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাগুরা বৌবাজার এলাকায় গত মঙ্গল ও বুধবার এ ঘটনা ঘটেছে।

তাদের অভিযোগ, মিলন পাল নামের ওই ব্যবসায়ীকে কৌশলে জেলে পাঠিয়ে তাঁর দুটি বাড়ি ও একটি গাড়ি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সংসদ সদস্য ও তাঁর ছেলে।

মায়ের নামে লাইসেন্স করা অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, বেসামাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, দলীয় নেতাকর্মীদের মারধরসহ রুমনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। কিছুদিন আগে শ্যামনগরের একটি রিসোর্ট থেকে তিন তরুণীসহ তাঁকে আটক করেছিল পুলিশ। মায়ের ব্যবহৃত জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়ি নিয়ে ওই রিসোর্টে রাত কাটাতে গিয়েছিলেন রুমন।

সাতক্ষীরা সদরে খান মার্কেট এলাকায় স্বর্ণকারপট্টিতে মিলন জুয়েলার্স নামে মিলন পালের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। মিলনের বাবা দেবদাস পাল জানান, তাঁদের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরের সুলতানপুর সাহাপাড়ায়। সম্প্রতি বৌবাজার এলাকায় মিলন একটি খামারবাড়ি ও দাসপাড়ায় একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। গত মে মাসের শেষের দিকে মিলনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন রুমন। বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই গত জুনে বেলী নামের এক নারীকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ওই খামারবাড়িতে বসবাস শুরু করেন রুমন। গত ৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে সংসদ সদস্য রিফাত আমিন গরু দেখার জন্য ওই খামারবাড়িতে যান, রুমনও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ রুমন পুলিশ সঙ্গে নিয়ে মিলনের দাসপাড়ার বাড়িতে যান। কথা বলার এক পর্যায়ে পুলিশ মিলনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ জানায়, ২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার তলুইগাছা সীমান্তে ১৬ কেজি সোনা আটকের মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে মিলনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিলনকে ছাড়িয়ে আনার কথা বলে ৪ সেপ্টেম্বর রুমন তাঁদের (দেবদাস) কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেন।

মিলনের স্ত্রী শম্পা রানী পাল জানান, ওই নারীকে নিয়ে খামারবাড়িতে রুমনের অবস্থানের বিরোধিতা করেছিলেন মিলন। এর জের ধরে তাঁকে (মিলন) গ্রেপ্তার করানো হয়। মিলন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাঁর প্রাইভেট কারটি ব্যবহার করছিলেন রুমন। খামারবাড়িতে রুমনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল স্থানীয়রা। গত মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে পুলিশ এসে দুজনকে ওই ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলে। তবে রুমন সে কথা আমলে নেননি। পুলিশ চলে যাওয়ার পর সাড়ে ১১টার দিকে তিনি (শম্পা) খামারবাড়ির সামনের ফটকে তালা দিয়ে তাঁর শ্বশুরের সঙ্গে তাঁদের সুলতানপুরের বাড়িতে চলে আসেন। এর আগে রবি, সোম ও মঙ্গলবার পর্যায়ক্রমে খামার থেকে ২০ লাখ টাকা মূল্যের ১৩টি গরু নিয়ে যান রুমন।

স্থানীয়রা জানায়, পুলিশের পর তারাও চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিলে একপর্যায়ে রুমন খামারবাড়ি ছাড়েন। মিলনের মা কল্পনা রানী পাল জানান, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রিফাত আমিন ও রুমন একটি গাড়িতে করে তাঁদের সাহাপাড়ার বাড়িতে আসেন। তাঁরা খামারবাড়ির চাবি চান। পরদিন চাবি দেওয়ার কথা বললে রিফাত আমিন ও রুমন চলে যান। কিন্তু রাত ৮টার দিকে মা-ছেলে মিলনের খামারবাড়িতে গিয়ে তালা ভেঙে মিলনের ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটি বের করার চেষ্টা করেন। তবে স্থানীয়দের বাধার মুখে ব্যর্থ হন।

স্থানীয়রা জানায়, বুধবার সকালে রিফাত আমিন ও রুমনসহ সাত-আটজন মিলনের খামারবাড়ির সামনে যায়। স্থানীয়রা জানতে চাইলে সংসদ সদস্য বলেন, ওসি সাহেব বাড়ির তালা ভেঙে প্রাইভেট কার বের করে নিয়ে যেতে বলেছেন। তাই তালা ভাঙা হবে। একপর্যায়ে তারা খামারবাড়ির পেছনের ফটকের তালা ভেঙে নিচতলার দরজার তালা কেটে ফেলে। পরে তারা দোতলায় ও গাড়ি রাখার ঘরের দরজার তালা ভেঙে ফেলে ঘরের মধ্যে থাকা টাকা, প্রাইভেট কার, একটি মোটরসাইকেল ও সোনার গয়নাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। ঘটনার সময় সাংবাদিকদের কাছে সংসদ সদস্য বলেন, তিনি ওসির অনুমতি নিয়ে এসেছেন।

তবে সাতক্ষীরার এসপি আলতাফ হোসেন এবং সদর থানার ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা দাবি করেন, তাঁরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

ঘটনার পর সাতক্ষীরা জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য গোষ্ট বিহারী মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার শীল, সদর শাখার সাধারণ সম্পাদক নিত্যানন্দ আমিনসহ কয়েকজন নেতা মিলনের খামারবাড়িতে যান। তাঁরা সংসদ সদস্য ও তাঁর ছেলের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে রিফাত আমিন বলেন, আওয়ামী লীগের জন্য তিনি বহু কাজ করেছেন। তবে দলের একটি মহল রুমনকে জড়িয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আর ওই বাড়ির (খামারবাড়ি) মধ্যে রুমনের জিনিসপত্র ছিল। সেসব আনতে গিয়েছিলেন তিনি।

ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে রিফাত আমিন বলেন, সাতক্ষীরা থানার ওসি ফটক ও দেয়াল ভেঙে প্রাইভেট কারসহ রুমনের জিনিসপত্র বের করে নিয়ে আসার অনুমতি দিয়েছেন।

গরু নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বলেন, রুমন ও মিলন দুই বন্ধু। তাঁরা মিলে একসঙ্গে গরুর খামারের ব্যবসা করেন। খামারে তাঁর ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ ছিল।

মিলনকে ছাড়িয়ে আনার জন্য তাঁর পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অবিযোগ অস্বীকার করে রুমন বলেন, মিলনকে জামিনে মুক্ত করে আনার জন্য তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সদর থানার ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা জানান, তিনি খবর পেয়ে মিলন পালের ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন। গ্রামবাসী তাঁকে জানিয়েছে, তিনি ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে রিফাত আমিন উপস্থিত থেকে ওই বাড়ি থেকে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে গেছেন।

মিলনের বাবা দেবদাস পাল জানান, খামারে রুমনের কোনো বিনিয়োগ ছিল না। মিলনের দুটি বাড়ি ও একটি গাড়ি দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য ও তাঁর ছেলে। বাড়ি ভেঙে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গতকাল রাতে তাঁর (দেবদাস) মামলা করার কথা ছিল।


মন্তব্য