kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টাম্পাকোয় আরো ৫ লাশ, উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী

ধ্বংসস্তূপে লাশের গন্ধ, মামলা দায়ের, কর্তৃপক্ষ লাপাত্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাজীপুর   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



টাম্পাকোয় আরো ৫ লাশ, উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত টঙ্গীর টাম্পাকো কারখানায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য বেসামরিক সংস্থা। ছবি : আইএসপিআর

টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও ধসের ঘটনার ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও উদ্ধার অভিযান এখনো শেষ হয়নি। ভারী যন্ত্র দিয়ে সোমবার থেকে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর ও ফায়ার সার্ভিস।

উদ্ধার অভিযানে লাশের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। গত সোমবার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আরো চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বুধবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একজন।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনায় গত রবিবার রাতে টঙ্গী থানায় টাম্পাকোর মালিক সৈয়দ মকবুল হোসেনসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছেন পার্শ্ববর্তী পোশাক কারখানার নিহত এক শ্রমিকের বাবা। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছেন, এ ঘটনায় শ্রম আইনেও মামলা করা হবে। তবে গতকাল পর্যন্ত অভিযুক্ত মালিক ও কোনো কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। তিনটি তদন্ত কমিটির লোকজন বলছেন, ভবনটির নকশা, নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও কর্তৃপক্ষের কাউকে খুঁজে না পাওয়ায় উদ্ধারকাজ ও তদন্তে ব্যাঘাত ঘটছে। এ ছাড়া গ্যাসলাইনের বিস্ফোরণ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ।

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ : ঘটনাস্থলের পাশে স্থাপিত জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, গতকাল পর্যন্ত টাম্পাকো দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৩৪ জন। গত রবিবার পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ২৯। সোমবার উদ্ধারকাজের সময় সকালে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুটি মৃতদেহ এবং দুপুরে সেনা সদস্যরা দুটি মৃতদেহ উদ্ধার করেন। এদের মধ্যে দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাঁরা আগে নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন। একজন হলেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের ঝিগারবাড়িয়ার মমতাজ আলীর ছেলে ইসমাইল হোসেন (৪৫)। তিনি টাম্পাকোর অপারেটর ছিলেন। আরেকজন হলেন টঙ্গীর আমতলী এলাকার দীলিপ দাশের ছেলে রাজেশ দাশ (২২)। তিনি ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এ ছাড়া গত বুধবার রাজধানীর ধানমণ্ডির নর্দান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কারখানাটির লেদ সেকশনের ইনচার্জ মনোয়ার হোসেন (৪০)। তিনি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার আনাখন্দ এলাকার মমতাজ উদ্দিন দেওয়ানের ছেলে। মনোয়ারের ভাতিজা রবিউল বাশার সুজন জানান, মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে তিনি মারা যান। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে টঙ্গীর ফকির মার্কেট এলাকায় (জাপানি বাড়ি) ভাড়া বাড়িতে থাকতেন মনোয়ার।

গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাসরিন পারভিন কালের কণ্ঠকে জানান, এখন পর্যন্ত ১১ জন নিখোঁজ আছে। ২৮ জনের লাশ হস্তান্তরের পর ছয়জনের লাশ শনাক্ত না হওয়ায় মর্গে পড়ে আছে। এই হিসাবে পাঁচজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরো লাশ থাকতে পারে। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

সব আসামি লাপাত্তা : টঙ্গী থানার ওসি ফিরোজ আলম তালুকদার জানান, গত রবিবার রাতে চাঁদপুরের উত্তর মতলব উপজেলার আ. কাদির নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে অবহেলাজনিত কারণে হত্যার অভিযোগে একটি মামলা করেছেন। তিনি টাম্পাকোর পাশের পোশাক কারখানার নিহত শ্রমিক মোহাম্মদ হোসেন জুয়েলের বাবা। জুয়েলও টাম্পাকো দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

ওসি জানান, দণ্ডিবিধির ৩০২, ৩০৭, ৩২৬, ৩৩৬, ৩৩৮, ৪২৭ ধারায় এই মামলা করা হয়। এতে টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ মকবুল হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ, মকবুলের স্ত্রী মোসাম্মদ পারভীন, মহাব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মনির হোসেন, ব্যবস্থাপক (সার্বিক) সমীর আহমেদ, উপমহাব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন ও ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মোহাম্মদ হানিফকে আসামি করা হয়েছে।

বাদী এজাহারে অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে মৃত মোহাম্মদ হোসেন জুয়েল টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর নর্দান গ্রুপের পোশাক কারখানার কর্মী ছিলেন। থাকতেন পূর্ব আরিচপুরে। গত শনিবার ভোরে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে টাম্পাকোর পাশে এসে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে তিনিও প্রাণ হারান। বাদী বলেন, তিনি কর্মীসহ সবার কাছে শুনেছেন, কারখানাটির ভবন ও বয়লার ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। নিরাপদ নয় জেনেও মালিক, কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের অবহেলার মাধ্যমে শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছে।

আটকে আছে তদন্ত : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বুধবার বলেন, ‘কারখানার নকশা না থাকায় ভেতরে কোথাও দাহ্য পদার্থ আছে কি না, থাকলে কী কী আছে তা জানা যাচ্ছে না। সে কারণে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থলে অনেক ড্রাম ফুলেফেঁপে আছে। এখনো আগুন দেখা যাচ্ছে। এগুলোর ভেতরে কী আছে তা জানা দরকার। ’

এদিকে ছয় দিন পার হলেও তদন্ত এগিয়ে নিতে পারেনি প্রশাসনের তিনটি কমিটি। গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রায়হানুল ইসলাম বলেন, ‘নথিপত্র দেখে তদন্ত করতে পারলে ভালো হতো। আমরা সেটা পারছি না। এর পরও চেষ্টা চলছে। ’ প্রায় একই কথা বলেন ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারী পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) বদিউজ্জামান।

উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী : গত সোমবার থেকে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীদের সঙ্গে যোগ দেয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একটি দল। ঈদের দিনও চলেছে সেই কাজ। তারা ভারী যন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ করছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে কোনো লাশ আছে কি না তা তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে। এ কাজের সময় ভেতর থেকে পচা লাশের গন্ধ বেরিয়ে আসছে।


মন্তব্য