kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

নকল এলাচ

লিমন বাসার, বগুড়া   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নকল এলাচ

সাবধান! খয়ের মিশিয়ে জংলি তারাগোটা চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে কালো এলাচ হিসেবে। অন্যান্য মসলায়ও মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক।

মানবদেহে সাইপারমেথরিনের সহনীয় মাত্রা ০.০১ পিপিএম হলেও বাজারে বিক্রি হওয়া মসলায় পাওয়া গেছে গড়ে ০.৭৩ পিপিএম। এ ছাড়া ডায়াজিননের সহনীয় মাত্রা ০.০১ পিপিএম হলেও বাজারজাত করা বিভিন্ন মসলায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ০.১৯ পিপিএম। আর ভোক্তার শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে চলেছে মসলায় মেশানে এসব রাসায়নিক। একইভাবে মরিচে মেশানো হচ্ছে আলফাটক্সিন নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এই মিশ্রণও মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, সম্প্রতি বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত হওয়া কালো এলাচের সঙ্গে খয়েরের প্রলেপযুক্ত এক ধরনের জংলি গোটা মেশানো হচ্ছে। এটির আসল নাম তারাগোটা, যা মূলত সিলেটের মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের বনে হয়ে থাকে। এটি সাধারণ এলাচের মতো দেখতে। আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কেমিক্যাল ও রং মিশিয়ে এগুলো কালো এলাচ বলে বাজারে চালিয়ে দিচ্ছে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অন্য এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাজারজাত হওয়া বিভিন্ন গুঁড়া মসলায় (মরিচ, হলুদ ও মিক্সড মসলা) মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের দ্রবণ পাওয়া গেছে। পরিকল্পিতভাবেই এসব গুঁড়া মসলায় নিম্নমানের কাঁচামালের সঙ্গে ইট, কাঠ, ভুট্টা ও চালের গুঁড়া মেশানো হচ্ছে। এছাড়া স্বাদ, গন্ধ ও স্থায়িত্ব আনতে মানবদেহের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর রাসায়নিক ক্রোমাটেড, মেটানিল ইয়োলো, টেক্সটাইল ডাই পিউরি, পেপরিকা, ফিটকিরিসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় মানব খাদ্যের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান মসলায় এই ভেজাল দিচ্ছে। সম্প্রতি বগুড়া শহরের রাজা বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় বিভিন্ন মসলার দোকান থেকে প্রায় ২০ বস্তা জংলি তারাগোটা উদ্ধার করা হয়। সেই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় বেশ কয়েকটি জারিকেনবোঝাই কেমিক্যাল ও খয়ের। জানা গেছে, এই কেমিক্যালে ভিজিয়ে খয়ের মিশ্রণ করে প্রতারকচক্র তারাগোটাকে কালো এলাচে রূপ দিচ্ছে। পরে আসল এলাচের গন্ধ আনার জন্য ওই কেমিক্যাল স্প্রে করে সেগুলো রোদে শুকিয়ে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকরা বলছেন, মসলায় মেশানো ইট, কাঠ, ভুট্টা ও চালের গুঁড়া, ক্রোমাটেড, মেটানিল ইয়োলো, টেক্সটাইল ডাই পিউরি, পেপরিকা, ফিটকিরিসহ বিভিন্ন কীটনাশক ফুটিয়ে রান্না করলেও এর বিষক্রিয়া নষ্ট হয় না। আর দীর্ঘদিন এসব মসলা গ্রহণে বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের আশঙ্কা থাকে।

বগুড়ার রাজা বাজারে বিভিন্ন মিলে গিয়ে দেখা গেছে, মরিচ ও হলুদের সঙ্গে মেশানোর জন্য মরিচ ও হলুদের সাদা, কালো, পচা, বোঁটা, বীজসহ খাবার অনুপযোগী নানা উপাদান সংরক্ষণ করা হয়েছে। একইভাবে মরিচের বস্তা ডাবল পলিথিনে মুড়িয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা রাখা হচ্ছে চটের বস্তায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ও দীর্ঘদিন খোলা থাকায় মরিচে ময়েশ্চারসহ নানা উপাদানে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতার প্রভাবে এসব কাঁচামালে ময়েশ্চারসহ জন্ম নিচ্ছে মানব শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টির উপাদান আলফাটক্সিন।

আবার গুঁড়া মরিচের রং গাঢ় লাল করতে উৎপাদক কম্পানিগুলো মেশাচ্ছে উজ্জ্বল লাল বর্ণের স্বাদ-গন্ধহীন পেপরিকা।

এ ছাড়া সঠিক পদ্ধতিতে মরিচ ধোয়া ও না শুকানোর কারণে গাছে ব্যবহার করা রিংডেন, ইউনালফস, এসিফেড, টায়োফজ, সাইপারমেথরিন, ডাইকোফল, ডায়াজিনন, স্যামকোজলসহ বিভিন্ন কীটনাশক শুকনা মরিচে থেকে যাচ্ছে। এসব কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব রান্নার পরও থেকে যায়।

মসলা গবেষকরা জানান, দেশে বছরে মরিচের চাহিদা প্রায় দুই লাখ টন। এর মধ্যে উৎপাদন হয় এক লাখ ৪২ হাজার টন। আমদানি ও চোরাই পথে আসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টন। আর মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশিটাই পূরণ হয় বগুড়ার গাতবলী ও সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলের উৎপাদন থেকে। অনেক নামিদামি কম্পানিই এই অঞ্চল থেকে মরিচ সংগ্রহ করে থাকে।

দেশে হলুদের চাহিদা বছরে প্রায় দুই লাখ টন (বীজসহ)। এর মধ্যে দেশে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় প্রায় ৮৭ হাজার টন (প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮৭ টন)। অবশিষ্ট প্রায় সোয়া লাখ টন আমদানি করা হয়। বগুড়া অঞ্চলে মাটির নিচ থেকে হলুদ (অপরিপুষ্টসহ) ওঠানোর পর সঠিক নিয়মে ঘাম ঝরানো, সিদ্ধ ও শুকানো হচ্ছে না। ফলে রং হারাচ্ছে হলুদ। আর এই রং ফেরাতে ও ওজন বাড়াতে সিদ্ধ করার সময় তাতে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক ক্রোমাটেড। এ ছাড়া শুকানোর পর মিশ্রণ করা হচ্ছে মেটানিল ইয়োলো, ফিটকিরি, টেক্সটাইল ডাই পিউরিসহ বিভিন্ন রাসায়নিক। মিক্সড মসলায় ব্যবহার হচ্ছে খুবই নিম্নমানের উপকরণ। এমনকি মূল্যবান দারুচিনির পরিবর্তে নিম্নমানের ক্যাসিয়াসহ বিভিন্ন রাসায়নিকের ব্যবহার হচ্ছে মিক্সড মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র এক পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে বাজারজাত হয় খ্যাত-অখ্যাত কম্পানির দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার গুঁড়া মসলা। এর বৈধভাবে আমদানি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টন গুঁড়া মসলা (পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, ধনিয়া, জিরা, লবঙ্গ, দারুচিনি, এলাচ ইত্যাদি)।

একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর কেবল কোরবানির ঈদ মৌসুমেই তিন লাখ টন পেঁয়াজ, দেড় লাখ টন রসুন, দুই লাখ টন আদা, এক লাখ টন হলুদ এবং দুই শ টন করে জিরা, দারুচিনি, কালো এলাচ ও সাদা এলাচ বিক্রি হয়ে থাকে।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মসলায় মেশানো রাসায়নিক দ্রব্যের জীবাণু থেকে মানবদেহে ক্যান্সার, কিডনি, লিভারসহ কমপক্ষে ৫০ ধরনের মারাত্মক রোগ ছড়াতে পারে।

মসলায় ক্ষতিকর রাসায়নিকসহ বিভিন্ন ভেজালের মিশ্রণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক কফিল উদ্দিন বলেন, ‘ভেজাল খাদ্যসামগ্রী মানুষকে মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দিচ্ছে। ভেজাল ও কীটনাশক মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করায় সব বয়সের মানুষ মারাত্মক সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ’


মন্তব্য