kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাজধানীর কোরবানির পশুর হাট

ক্রেতাদের বাজেট বাড়াতে হচ্ছে

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ক্রেতাদের বাজেট বাড়াতে হচ্ছে

ঢাকা ইতিমধ্যে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। ভিড় জমেছে লঞ্চ, বাস ও রেলস্টেশনে।

ছুটছে ঘরমুখো মানুষ। একই রকম ব্যস্ততা নগরের বিভিন্ন স্থানে বসা কোরবানির পশুর হাটগুলোতে। অস্থায়ী এসব হাটে এখন দিন-রাত একাকার। ঢাকায় যারা কোরবানি দেবে তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে সাধ্য আর পছন্দ মিলিয়ে পশু কিনে নিয়েছে। যারা এখনো পশু কেনেনি তারা আজ সোমবার শেষ দিনে হাটগুলোতে ভিড় জমাবে। সেই সুবাদে হাটগুলোতে থাকবে ক্রেতার ব্যাপক ভিড়। আর তা অব্যাহত থাকবে গভীর রাত পর্যন্ত। তবে ইতিমধ্যে যারা পশু কিনেছে তাদের বেশির ভাগেরই মন্তব্য, বাজার চড়া। বাজেটের টাকায় পছন্দের পশুটি মিলছে না। বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এবার ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। এসব হাটের একাধিক ব্যবসায়ী ও ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি হাটেই গতকাল সবচেয়ে বেশি পশু বিক্রি হয়েছে। আজ পশুর দাম তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমতে পারে বলেও ধারণা করছে কেউ কেউ। অন্য বছরের তুলনায় এবার হাটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার বিষয়েও খুশি ক্রেতা-বিক্রেতারা। পশু কিনে যারা কিছুটা দূরের গন্তব্যে যাচ্ছে তাদের জন্য হাটের পাশেই প্রস্তুত রয়েছে মিনি ট্রাক। ওদিকে যারা গরু কিনে বাসাবাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে তাদের সুবিধার্থে অলিগলিতে বসেছে গোখাদ্যের ছোট ছোট ভ্রাম্যমাণ দোকান।

গতকাল রবিবার রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় হঠাৎই ঝেপে আসে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মধ্যেও স্থায়ী-অস্থায়ী প্রতিটি হাটে দেখা গেছে ক্রেতার ভিড়। তারা ঘুরে ঘুরে দেখছে। দরদাম করছে। বাজেটের মধ্যে পছন্দের পশু পেয়ে গেলে কিনে নিচ্ছে। তবে এবার শুরুর দিন থেকেই রাজধানীতে গরুর দাম একটু ওপরের দিকে। শেষ মুহূর্তে এসে দাম একটু কমার সম্ভাবনার কথা বলাবলি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এমনটা দাবি করছে বেশির ভাগ ক্রেতা। তারা বলছে, যে বাজেট নিয়ে তারা হাটে যাচ্ছে তাতে পছন্দের পশুটি মিলছে না। বাধ্য হয়ে কিছুটা বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। এর পরও পছন্দের পশুটি কিনতে পেরে সবার মুখেই আনন্দের ঝিলিক।

গতকাল রাজধানীর মেরাদিয়া বাজার হাটে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। সকাল থেকেই পুরোদমে পশু বিক্রি চলছে বলে জানান হাটের ইজারাদার শাহ আলম। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে হাট থেকে দুটি গরু কিনে বনশ্রীর বাসায় ফিরছিলেন মনিরুল হক। দাম কত জানতে চাইতেই মনিরুল হক বলেন, ‘কোরবানির জন্য আমার বাজেট ছিল এক থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। হাটে যাওয়ার আগেই খবর পেয়েছিলাম বাজার চড়া। শেষ পর্যন্ত বাজেটের ওপরে আরো প্রায় ৪০ হাজার টাকা বেশি লেগেছে। ’

সকাল ১১টার দিকে হঠাৎই আকাশ ছাপিয়ে নামে বৃষ্টি। ভারি বর্ষণে অল্প সময়ের মধ্যেই হাটের পরিবেশ পাল্টে যায়। কাদায় মাখামাখি অবস্থা পুরো হাট ও আশপাশ এলাকা। কোনো কোনো হাটের ভেতরে পানি জমে যায়। ফলে আনন্দের হাটে যোগ হয় কিছুটা বাড়তি দুর্ভোগ। তবে বৃষ্টিতেও পশু বিকিকিনি থেমে থাকেনি।

দুপুর ১২টার দিকে মেরুল বাড্ডা আফতাবনগর পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাতে হাতে রশি ধরে গরু নিয়ে মিছিলের মতো লোকজন বেরিয়ে আসছে। আবার অন্য পাশ দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে হাটে যাচ্ছে শত শত ক্রেতা। পুরো এক থেকে দুই কিলোমিটার এলাকা বলতে গেলে পশুর দখলে। হাটে আসা সব ক্রেতার মুখে একটাই কথা, প্রচুর গরু থাকা সত্ত্বেও দাম নাগালের বাইরে। হাট থেকে যেসব গরু নিয়ে ক্রেতারা বাসাবাড়িতে ফিরছে তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, মোটামুটি মাঝারি আকারের গরুর দামও ৬০ হাজার টাকার ওপরে।

হাটে কথা হলো বাড্ডার বাসিন্দা শাহ নেওয়াজ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি ছোট আকারের একটি গরু দেখিয়ে বললেন, ‘ভাই বলেন, এমন সাইজের গরু কিভাবে ৭৫ হাজার টাকা হয়? আমি ৬৮ হাজার টাকা বলে একাধিকবার ঘুরছি। বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে মনে হলো তিনি গরু বিক্রি করতে আসেননি। কোনো গরু ব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে দামাদামি করা যায় না। একবার দাম বলে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। ’

আফতাবনগর হাট থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম খোকন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার এ গরুর দাম কোনোভাবেই ৮০ হাজার টাকার ওপরে হতে পারে না। এখন ঈদের বাকি এক দিন; দাম যা-ই হোক গরু তো কিনতেই হবে। ’

সাঈদ নামের এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, ‘সোমবার (আজ) পশুর দাম কিছুটা কমতে পারে। কারণ শনি ও রবিবার রাতের মধ্যে রাজধানীর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লোক পশু কিনে ফেলবে। ফলে এখনো যেসব ব্যবসায়ী গরুর ট্রাক নিয়ে রাস্তায় আছে তারা এসে কিছুটা কমেই বিক্রি করতে বাধ্য হবে। ’

এই বিক্রেতার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন দনিয়া কলেজ মাঠসংলগ্ন হাটের ইজারাদার আবুল কামাল আজাদ। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বসবাসরত একটি বড় অংশ ঈদের আগের দিন গরু কিনে থাকে। সেই লক্ষ্যে আমাদের আরো কিছু ব্যবসায়ী গরু নিয়ে রাস্তায় আছে। তারা ঈদের আগের দিনটিকেই টার্গেট করেছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা, শেষ দিন বেশি মুনাফা করে গরু বিক্রি করতে পারবে। ’

বাড্ডা সাঈদনগর হাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রচুর গরু বিক্রি হচ্ছে। ছাগলও বিক্রি হচ্ছে বেশ। কুষ্টিয়া থেকে ১৩টি খাসি নিয়ে হাটে এসেছেন আজহার উদ্দিন। তিনি জানান, ছোট খাসির দাম সাত থেকে আট হাজার টাকা। আর একটু বড় খাসি বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ২০ হাজার টাকায়। রবিবার সকালে হাটে আসার পর তাঁর তিনটি খাসি বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

হাটের ইজারাদার সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের হাটে এবার ছয় থেকে সাত হাজার গরু এসেছে। বিক্রিও বেশ ভালো। আমরা এবার পশুর হাটের হাসিলও সিটি করপোরেশন নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারেই আদায় করছি। কখনো কখনো বড় গরুর ক্ষেত্রে কমও নিচ্ছি। ’ এই হাট ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় গরুটির বিক্রেতা দাম হাঁকাচ্ছেন সাত লাখ টাকা। তবে চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৯টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) এবার অস্থায়ীভাবে ১৪টি পশুর হাট বসেছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনে যুক্ত হওয়া নতুন ইউনিয়ন সারুলিয়ায় বসেছে একটি হাট।


মন্তব্য