kalerkantho


পারাবতে ত্রুটি, স্বস্তি উধাও রেলপথেও

পার্থ সারথি দাস   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পারাবতে ত্রুটি, স্বস্তি উধাও রেলপথেও

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় গতকাল রবিবার সকাল ৯টায় রেলপথে ঠায় দাঁড়িয়ে পারাবত এক্সপ্রেস। ট্রেনের সব কটি কোচের বিভিন্ন জানালায় যাত্রীদের উদ্বিগ্ন মুখ। ট্রেন থেকে নেমে কেউ কেউ বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। সিলেট নগরের কানিশাইলের বাসিন্দা জালাল আহমেদ বলেন, ‘ফ্যান চলে না। বইতে বইতে ঘামিয়া পরে ট্রেইন থাকি নামি গেছি। কুন সময় ট্রেইন ছাড়ব বুঝতাম পাররাম নায়। ’ ট্রেন বিকল হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় কোচের ভেতরের ফ্যানও। তা সত্ত্বেও ‘যদি ট্রেন ছাড়ে’—এই আশায় কোচে ভিড়ের মধ্যে কোনো রকমে বসে ছিলেন জালাল আহমেদের স্ত্রী রুবি বেগম ও তাদের পাঁচ বছরের ছেলে আদিল। রংপুর যেতে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে সোয়া তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে জুঁই ইসলামকে। কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়েই জানতে পারেন, কোনো ট্রেন চলছে না। জালাল, জুঁইয়ের মতো হাজার হাজার ট্রেনযাত্রীকে গতকাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ আগের দিন পর্যন্ত রেলপথে ঈদযাত্রায় স্বস্তি ছিল অনেকখানি।

ঢাকা-সিলেট রুটের আন্তনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস যাত্রা শুরু করার ২০ মিনিটের মধ্যে বিকল হয়ে পড়ে খিলক্ষেত রেলপথে। এ কারণে গতকাল সকাল থেকে একের পর এক ১১টি ট্রেন আটকা পড়ে। এতে কমলাপুর থেকে ট্রেনের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়। রাত জেগে আগাম টিকিট জোগাড় করে ট্রেনে উঠেই ভোগান্তির মুখে ঈদযাত্রার আনন্দ উবে যায় যাত্রীদের। আড়াই ঘণ্টা পর পারাবত এক্সপ্রেস সচল হলে কমলাপুর থেকে ট্রেন চলাচলও শুরু হয়।

অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট বিপর্যয় এবং সেতুতে গাড়ির গতি কম থাকায় গতকালও ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যানজট ছিল তীব্র। ফিরতি বাস না পাওয়ায় শনিবার রাতের নির্দিষ্ট বাস ছেড়েছে গতকাল সকাল কিংবা দুপুরে। যানজটে পড়ে বাস থেকে নেমে অনেকে ছোট বাহনে করে ঘাট পার হয়েছে। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে দুর্ভোগে সময় পার করে পথে পথে যানজট ঠেলে বাড়ি গেছে কেউ কেউ ১৫ ঘণ্টায়ও। থেমে থেমে যানজট ছিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে। চন্দ্রা, কালিয়াকৈর, পাকুল্লা, মির্জাপুর, কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে এই জট ছিল তীব্র।

রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক পারাবত ট্রেনে নতুন ১২টি কোচ সংযোজন করে এর আনুষ্ঠানিক চলাচল উদ্বোধন করেছিলেন গত ২ সেপ্টেম্বর। ৯ দিনের মাথায় গতকাল ট্রেনের দুটি কোচের এয়ার প্রেশার ব্রেক আউট হয়ে যায়। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার ২০ মিনিটের মাথায় বিমানবন্দর রেলস্টেশনের আগে খিলক্ষেতে ট্রেনটি থেমে যায়।

এর কিছুক্ষণের মধ্যে কমলাপুর থেকে খুলনার উদ্দেশে রওনা করা সুন্দরবন এক্সপ্রেসও আটকে পড়ে খিলক্ষেতে। সুন্দরবনে আগের সাতটি কোচের সঙ্গে পাঁচটি কোচ বাড়িয়ে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে চালানো হচ্ছিল। সকাল ৭টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে কমলাপুর থেকে যাত্রা করা সোনার বাংলা এক্সপ্রেসও বিকল পারাবতের পেছনে আটকে পড়ে খিলক্ষেতে। এর আগে তেজগাঁওয়ে থামিয়ে রাখা হয় দেওয়ানগঞ্জের উদ্দেশে কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা তিস্তা এক্সপ্রেস। এই ট্রেনেও নতুন কোচ লাগানো হয়েছিল গত ২ সেপ্টেম্বর।

পথ বন্ধ থাকায় কমলাপুরেই আটকে থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর প্রভাতী ও কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, ঢাকা-রাজশাহী রুটের ধূমকেতু এক্সপ্রেস, ঢাকা-মোহনগঞ্জ রুটের মহুয়া এক্সপ্রেস, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জমুখী ঈদের বিশেষ ট্রেন, ঢাকা-গাজীপুর রুটের জয়দেবপুর এক্সপ্রেস, ঢাকা-তারাকান্দি রুটের অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, ঢাকা-রংপুর রুটের রংপুর এক্সপ্রেস ও ঢাকা-দিনাজপুর রুটের একতা এক্সপ্রেস।

অগ্নিবীণা ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল পৌনে ১০টা। ঢাকা-তারাকান্দি রুটের এই ট্রেন ১১টা ৩২ মিনিটে কমলাপুর থেকে ছাড়ে। সেখানে নিজ নিজ আসনে বসে থেকে যাত্রার শুরুতেই গরম ও ভিড়ে ভোগান্তির মধ্যে পড়ে যাত্রীরা। কমলাপুরে অন্যান্য ট্রেনেও তখন যাত্রীদের মধ্যে ছিল মারাত্মক অস্বস্তি। ময়মনসিংহের গফরগাঁও যেতে ট্রেনে উঠেছিলেন সাংবাদিক আখতার হোসেন। ট্রেন ছাড়ার দুই ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌঁছেন তিনি। কিন্তু ছাড়ার আগে কমলাপুরে বসে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। কেবিনে বসে থাকলেও তাতে এসি ছিল না। মাঝেমধ্যে ফ্যানও বন্ধ ছিল। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল সীমাহীন।

ঢাকা-রাজশাহী রুটের ধূমকেতু ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৬টা। ওই ট্রেনে ভিড়ের মধ্যে কোনো রকমে বসে থাকা যাত্রী ইকরাম হোসেন সকাল ১০টায় বলেন, ‘দাঁড়ানো ট্রেনে বিনা টিকিটের যাত্রী বাড়ছে, গরম বাড়ছে। ট্রেন কখন ছাড়বে সেই প্রশ্নের জবাব রেল কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি যাত্রীদের। ’

কমলাপুর রেলস্টেশন ব্যবস্থাপক সীতাংশু চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, পারাবতের ভ্যাকুয়াম জটিলতার কারণে এটি বিকল থাকে। ফলে রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অবস্থা স্বাভাবিক হতে থাকে।

টার্মিনালে বাসের অপেক্ষাই ফুরায় না : রংপুরের উদ্দেশে বাসে মহাখালী থেকে রওনা দেওয়ার পর ছয় ঘণ্টায় গাজীপুরের কালিয়াকৈর পার হচ্ছিলেন নুরুল ইসলাম। আগের দিন রাত ১টায় বাসটি ছাড়ার কথা ছিল। ৭ ঘণ্টা দেরিতে গতকাল সকালে সেটি ছাড়ে। বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় টার্মিনালে কাটাতে হয়েছে নুরুল ইসলামকে। সকাল ৯টায় হানিফ পরিবহনের বাসে রওনা দিয়ে বিকেল ৪টায় মির্জাপুর পার হচ্ছিলেন আরিফ হোসেন। সকাল ৭টায় গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে হানিফ পরিবহনের বাস পেতে জাহাঙ্গীর আলম সজীবের দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাগুরার উদ্দেশে রওনা দিয়ে সাড়ে ১১টায় পাটুরিয়ায় পৌঁছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তাঁকে বহনকারী বাসসহ কিছু বাস ফেরি পায়। ফেরি সংকট ও ঘাট বিপর্যয়ের কারণে এভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১ জেলার যাত্রীরা বিপাকে পড়ে। সজীব জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যানজট কমলেও ঘাটে বসে থাকতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শনিবার রাতে এই ঘাট হয়ে মাগুরা যেতে শফিকুল ইসলামের লেগেছে ১৬ ঘণ্টা। শফিকুল গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, কল্যাণপুরের বাস কাউন্টারে ফিরতি বাসের জন্য ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।

রংপুরের পথে কালিয়াকৈর পার হওয়ার সময় নুরুল ইসলাম গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, থেমে থেমে বাস চলছে। অনেকে চন্দ্রাসহ বিভিন্ন স্থানে নেমে গেছে। কেউ বাস বদল করেছে। কেউ কেউ পশু পরিবহনের ট্রাকে, পিকআপে উঠেছে। কেউ হেঁটে অন্য ছোট বাহন ধরে যানজটের অংশ পার হয়েছে। এ ছাড়া করার কিছু ছিল না। ঢাকা থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত গাড়ি চলে খুবই ধীরগতিতে। দুপুরে নারী ও শিশুরা বাসে ভিড়ে ও গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছিল বলে তিনি জানান।

গাবতলী, কল্যাণপুর, কলাবাগানসহ রাজধানীর বিভিন্ন কাউন্টারে শ্যামলী, হানিফ, টিআর, এসআর, এস আলমসহ বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে গতকাল ফিরতি বাসের জন্য যাত্রীদের দুর্ভোগ চোখে পড়েছে। কল্যাণপুরে দুপুরে শ্যামলী পরিবহনের বাসের জন্য চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে রাজশাহী যাওয়ার বাস পান জাহানারা পারভীন। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাসে উঠতে হয়েছে। তারপর তো গাড়ি চলছিল না। সাভার থেকে যানজট শুরু। পাটুরিয়া ঘাটের সাত কিলোমিটার আগে গাড়ির জট ছিল। ’

এদিকে সদরঘাটে বাড়িমুখো মানুষের ভিড় ছিল উপচে পড়া। লঞ্চ সংকটে গত শনিবার থেকেই যাত্রীর চাপ বাড়ছিল। ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও জায়গা মিলছিল না।

সড়কমন্ত্রী ব্যস্ত : ঈদযাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে তৎপর রয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে নিজ গাড়ি থেকে নেমে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকা বিভিন্ন পরিবহনের বাসে অভিযান চালান। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চান বাসের ভেতরের যাত্রীদের কাছে। যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করলে বাসের চালক, সুপারভাইজার, হেলপারকে অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দিতে নির্দেশ দেন সড়কমন্ত্রী। যেখানে নেত্রকোনার ভাড়া ৩০০ টাকা, গতকাল নেওয়া হচ্ছিল ৬০০ টাকা। তখন অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে এসব গাড়ির নাম ও নম্বর লিখে রাখতে পরিবহন কর্মকর্তাদের

নির্দেশ দেন মন্ত্রী। ওই সময় বিআরটিএকে একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠান বলে তিনি মন্তব্য করেন। টার্মিনালে বেশ কিছু কাউন্টার ঘুরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে যাত্রীদের একাধিক অভিযোগ শোনেন তিনি। এনা পরিবহন ছাড়া সব বাসই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছিল।

 


মন্তব্য