kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ত্যাগের মায়া

কালু আমার আরেক সন্তান

আহসান হাবিব, আঞ্চলিক প্রতিনিধি (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কালু আমার আরেক সন্তান

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের ভূতপাড়া গ্রামে বিক্রির আগে পালিত খাসির সঙ্গে রেহেনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বোনের কাছ থেকে একটি ছাগল উপহার পেয়েছিলেন রেহেনা বেগম। দেড় বছরের মাথায় সেই ছাগল জন্ম দেয় একটি খাসি।

রেহেনা সেই খাসির নাম রাখেন ‘কালু’। মমতা দিয়ে সন্তানের মতো তাকে লালন-পালন করতে থাকেন। পরিবারের অন্য ছেলেমেয়ের মতো কালুও শিখে যায় খুনসুটি। কালু বলে একবার ডাকলেই ছুটে এসে গায়ের ওপর পড়ে। বাড়ির আঙিনা, বারান্দা, এমনকি বিছানা পর্যন্ত কালুর ছোটাছুটি। রেহেনার ছেলেমেয়েরাও কালুকে খুব ভালোবাসে, যার যার মতো ভাষা বুঝে নেয় তারা।

দুরন্ত কালু কত দিন আশপাশের চারা গাছের ছাল ছিলে খেয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হয়েছে। কখনো কখনো বেধড়ক মার খেয়ে কালু বাড়ি ফিরেছে। রেহেনা ডেটলে তুলা ভিজিয়ে তার ক্ষতস্থানের শুশ্রূষা করেছেন। এভাবেই অবলা প্রাণীটির ওপর বাড়তে থাকে তাঁর মায়া।

মায়া হয়তো তৈরি হয় মায়া কেটে যাওয়ার জন্য। তবে কিছু কিছু মায়ার মাহাত্ম্য মাথা উঁচু করে থাকে। রেহেনা তাঁর কালুকে এবারের কোরবানিতে বিক্রি করে দিয়েছেন। কালুর দাম উঠেছে সাত হাজার টাকা। ক্রেতা যখন কালুর গলায় বাঁধা রশি ধরে টানছিল তখন রেহেনার মেয়ে মারুফা কাঁদতে শুরু করে। রেহেনা কালুর পিঠে থাবা মেরে বলেন, ‘যা কালু যা, তুই আমার আরেক সন্তান। সন্তানের মতোই তুই আমার সংসারে অন্ন জুটিয়ে গেলি। ’ এই বলে চোখের পানি ঝরল রেহেনার।

মা রেহেনার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নের নতুন বাবুপুর ভূতপাড়া গ্রামে। মূলত পদ্মার ভাঙনের পর অনন্ত ৮৫টি পরিবার এ গ্রামে বাস করে। দরিদ্র পরিবারগুলো পোষা খাসি, গরু বিক্রি করে সংসার চালায়।

একই গ্রামের অভাবের সঙ্গে লড়াই করা আরেক নারী শওকতারা। তিনিও সন্তানের মতো খাসি পালন করে আসছেন। তিনি তাঁর পালিত খাসিটিকে লালটু বলে ডাকতেন। এবার কোরবানিতে ৯ হাজার টাকায় লালটুকে বিক্রি করেছেন তিনি। শওকতারা বলেন, ‘প্রতি বেলা রান্নার সময় ভাতের পাতিলে দু মুঠো চাল বেশি দিতাম লালটুর জন্য। খিদে পেলেই সে আমার পিছে পিছে ঘুরত। অবলা প্রাণী, আমি তার ভাষা বুঝতাম। নিজের ভাতের থালা ছেড়ে দিয়েছি। লালটু চেটেপুটে খেয়েছে। আমি অবসরে বসে থাকলে গায়ের সঙ্গে হেলান দিত সে। আমি তখন তাকে সন্তানের মতো আদর করতাম। আমার ছেলেরা দিনমজুরির জন্য দিনমান বাড়ির বাইরে থাকে। তখন আমার সারাক্ষণের সঙ্গী ছিল লালটু। ’

সাহাপাড়া গ্রামের রাহেলা বেওয়ার এক ছেলে, এক মেয়ে। স্বামী মারা গেছেন দুই বছর আগে। সংসারে ছিল মাত্র দুটি ছাগল। ছাগল দুটি দুই বছরে ছয়টি খাসির জন্ম দেয়। এর মধ্যে গত কোরবানিতে দুটি বিক্রি করেন। এবার একটি বিক্রি করেছেন ৯ হাজার টাকায়। সেই টাকা দিয়ে ঈদের কেনাকাটা ও সংসারের টুকিটাকি অভাব মিটেছে। রাহেলা বেওয়া বলেন, ‘আমি যখন খাসিটি বিক্রি করছিলাম মনে হচ্ছিল নিজ সন্তান কোথাও চলে যাচ্ছে। সন্তানরা বাড়ি থেকে বিদেশে চলে যাওয়ার সময় যেমন লাগে, তেমন কষ্ট হচ্ছিল। ’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের নরশিয়া গ্রাম। এ গ্রামের দরিদ্র রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বড় মায়া বসে গেছে কোরবানির খাসিটির ওপর। কিন্তু কী আর করা, অভাবের কারণে সব মায়া ত্যাগ করে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। ’

নরশিয়া গ্রামের আরেক সংগ্রামী নারী রেফুল বেগম। তিনি এ বছর কোরবানিতে আট হাজার টাকায় একটি খাসি বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, ‘খাসিটি আমি চোখে চোখে রাখতাম। প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলে খাসিটিও আমার পিছে পিছে যেত। অভাবের কারণে তাকে বিক্রি করতে হলো। ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য খাসিটির গলায় যখন রশি দিই তখন মনে হচ্ছিল সন্তানের গলায় কেন রশি দিচ্ছি? আমি তার দিকে তাকাতে পারিনি। ক্রেতা যখন তাকে নিয়ে যাচ্ছিল, সে খুব  ডাকছিল। মনে হচ্ছিল তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। ’

 


মন্তব্য