kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিউটি বোর্ডিং

সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আপেল মাহমুদ   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

রাজধানীর পুরান ঢাকায় কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই দিনের জমজমাট আড্ডার বিউটি বোর্ডিং। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরফের মতো আড্ডা জমে। আবার বরফের মতোই আড্ডা গলে যায়।

তবু বেঁচে থাকে বন্ধু। আড্ডার মন থাকে তৃষ্ণায়। পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের লালকুঠি আর প্যারীদাস রোড থেকে একটু সামনে গেলে শ্রীশ দাস লেন। এখানে কালের সাক্ষী হয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং। একসময় দেশের প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, চিত্রশিল্পীরা এখানে মেতে উঠতেন আড্ডায়। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্ব বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিয়েছেন।

সেদিনের আড্ডার প্রাণভ্রমররা আজ অনেকেই নেই। কিন্তু ত্রিকালদর্শী বিউটি বোর্ডিংয়ের দালান যেন কবিগুরুর ছোটগল্প ‘ক্ষুধিত পাষাণ’। যেন এক টেবিলে বসে আছেন কবি শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও সৈয়দ শামসুল হক। তুমুল আড্ডায় কাঁপছে তাঁদের চায়ের কাপ। বাংলা কবিতার অমূল্য রতন রচনা হচ্ছে কবিতার খাতায় খাতায়। আজকের তরুণরা সেখানে আড্ডা দেন। কিন্তু সেদিনের সমৃদ্ধ আড্ডা তাঁদের কাছে কেবলই গল্প। সেদিনের আড্ডাটা যেন আজ আর নেই।

জানা যায়, কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী ও সৈয়দ শামসুল হক তাঁদের অনেক কালজয়ী লেখা লিখেছেন বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে। শামসুর রাহমানের কবিজীবনের সূত্রপাত হয়েছিল বিউটি বোর্ডিংয়েই। সেখান থেকে বিপ্লবী নলিনী কিশোর গুহ সম্পাদিত সোনার বাংলা পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ১৯৪৯ ছাপা হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পাণ্ডুলিপি বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে সম্পন্ন করেছিলেন আবদুল জব্বার খান। এখানে বসেই সুরকার সমর দাস সুর শোনাতেন। স্বাধীনতার আগে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, নায়ক রাজ্জাক, ফারুক, প্রবীর মিত্র, খান জয়নুল, তেজেন চক্রবর্ত্তী, নারায়ণ চক্রবর্ত্তী, অভিনেত্রী সুমিতা দেবী ও কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আড্ডাস্থল ছিল বিউটি বোর্ডিং।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বিউটি বোর্ডিং থেকে বেরিয়ে ডান দিকে গেলে একটু দূরে এক বাড়ির দোতলায় কবি শহীদ কাদরী থাকতেন। তিনি বিউটি বোর্ডিংয়ের রেস্টুরেন্টে সকাল-বিকেল চা খেতেন। শহীদ কাদরী একদিন আমাদের কয়েকজনকে বললেন, আমরা যেন এখানে বসি। তখন আমরা কিছু কিছু লিখছি, কিছু কিছু গল্প-কবিতা ছাপা হচ্ছে—এমন কয়েকজন এখানে আড্ডা শুরু করি। এর আগেও আড্ডা ছিল, পরেও ছিল। ’

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকাটি পশ্চিম বাংলায় স্থানান্তরিত হলে প্রহ্লাদ সাহা নামের এক ব্যবসায়ী একটি বাড়িকে বোর্ডিংয়ে রূপান্তর করেন। তিনি তাঁর বড় মেয়ের নামে বিউটি বোর্ডিংয়ের নামকরণ করেছিলেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়তম আড্ডাস্থল ছিল বিউটি বোর্ডিং। বোর্ডিংয়ের ভেতরে করমচা গাছতলায় চেয়ার নিয়ে বসতেন তিনি। সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিতেন। সময় পেলেই সেখানে যেতেন তাজউদ্দীন আহমদ। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় বোর্ডিংটির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটা আক্রোশ ছিল। ফলে বিউটি বোর্ডিংয়ের ভেতরেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়েছিল মালিক প্রহ্লাদ সাহা, ব্যবস্থাপক শীতল কুমার দাশ, চলচ্চিত্র অভিনেতা শামস ইরানী, অভিনেতা যোসেফ, চিত্রশিল্পী হারাধন বর্মণ, প্রকাশক হেমন্ত কুমার সাহা, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অহীন্দ্র চৌধুরী, শিক্ষক প্রভাতচন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন নিরপরাধ মানুষকে। এরপর দীর্ঘদীন বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডায় ভাটা পড়ে।

অবশ্য প্রহ্লাদ সাহার স্ত্রী প্রতিভা সাহা দুই ছেলেকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিংয়ের হারানো প্রাণ ফেরাতে চেষ্টা করেন। প্রহ্লাদ সাহার ছোট ছেলে তারক সাহা উদ্যোগী হয়ে কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জাদুকর জুয়েল আইচসহ আরো অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ১৯৯৫ সালের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা পুনর্মিলনী।

তারক সাহা জানান, সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব্বদের আড্ডা ধরে রাখার জন্য সেদিন ইমরুল চৌধুরী, কবি রফিক আজাদ, ফিরোজ কবির মুকুল, জাহাঙ্গীর হাবিব উল্লাহ, মোফাজ্জল হোসেন বিধু প্রমুখ বিউটিয়ানদের নিয়ে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট ‘বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ’ গঠন করেন।

এ ব্যাপরে কবি আসাদ চৌধুরীর বলেন, ‘বিউটিয়ানরা কোনো দিন বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডার স্মৃতি ভুলতে পারবেন না। আমি যত দিন বাঁচব, এ স্মৃতি নিয়েই বাঁচব। ’

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকেই বাংলাবাজার ঢাকার মুদ্রণ প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানকার কেতাবপট্টি ও বটতলার বই ছিল ঢাকাবাসীর আদি বইয়ের বাজার। পরে ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, জনসন রোড, নবাবপুর, রোকনপুর, গেণ্ডারিয়া ও ওয়ারীতে গড়ে ওঠে বইয়ের দোকান ও ছাপাখানা। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে বেশির ভাগ মুসলমান প্রকাশক, লেখক, বই ব্যবসায়ী, ছাপাখানার মালিক এবং বাইন্ডিংয়ে জড়িত কর্মচারীরা ঢাকায় চলে আসেন। কলকাতার বেশির ভাগ বই বাঁধাইকারী পূর্ববঙ্গ তথা মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল এলাকার ছিল। তারা সেখান থেকে চলে আসায় কলকাতায় বাঁধাই সংকটের কারণে কয়েক বছর ঠিকমতো বইয়ের ব্যবসা করা সম্ভব হয়নি। মূলত তাদের আনাগোনায়ই বাংলাবাজার ও প্যারীদাস রোড এলাকায় বইয়ের জমজমাট ব্যবসা শুরু হয়। একই সঙ্গে সেখানকার বিউটি বোর্ডিংয়ে কবি-সাহিত্যিক, লেখক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের আড্ডা শুরু হয়।

সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের স্মৃতিচারণা সূত্রে জানা যায়, ঊনসত্তর সালে ঢাকায় এসেই কবি অসীম সাহা প্রথম পা দেন বিউটি বোর্ডিংয়ে আহমদ ছফার সঙ্গে। সেখানে দেখতে পান শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখকে। ওখানে পরিচয় হয় হারাধন বর্মণের সঙ্গে, যিনি সে সময় বইয়ের কভার করতেন। ওই আড্ডা থেকেই আহমদ ছফার সম্পাদনায় ‘স্বদেশ’ পত্রিকা বের হয়। পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক ছিলেন অসীম সাহা ও মুনতাসীর মামুন।

কিছুদিন আগে বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে দেখা হয় প্রায় ৭৫ বছর বয়সী প্রদীপ কুমার দাস ওরফে পি কে দাসের সঙ্গে। বোর্ডিংয়ের মালিক তারক সাহার পাশে একটি চেয়ারে বসেছিলেন বর্ষীয়ান মানুষটি। জন্মস্থান চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায়। তবে ঢাকায় কাটছে শেষজীবন। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাস। বৃদ্ধ বয়সে তিনি নিয়মিত আড্ডা দিতে আসেন এখানে। কোনো দিন আসতে না পারলে অস্বস্তিতে ভোগেন। তাই যত ঝামেলা থাকুক না কেন, রোজই হাজিরা দিতে আসেন স্মৃতিময় স্থানটিতে। বললেন, ‘মরণের পরও যেন আরেকটি বিউটি বোর্ডিং পাই সে প্রার্থনা ভগবানের কাছে। ’


মন্তব্য