kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেয়াদোত্তীর্ণ ডিও দিয়ে সার পেতে মরিয়া সেই সিন্ডিকেট!

আরিফুজ্জামান তুহিন   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মেয়াদোত্তীর্ণ ডিও দিয়ে সার পেতে মরিয়া সেই সিন্ডিকেট!

চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটের অবৈধ সেই সার সিন্ডিকেট এবার মেয়াদোত্তীর্ণ কার্যাদেশ দিয়ে ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ডিএপি সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সিন্ডিকেটটি বিভিন্ন সময় প্রকৃত ডিলারদের কাছ থেকে সারের কার্যাদেশ বা ডিও কিনে নিয়েছিল।

এসব কার্যাদেশের মাধ্যমে এক অর্থবছরের মধ্যেই সার উত্তোলনের নিয়ম থাকলেও সিন্ডিকেটটি গত অর্থবছরে সার তোলেনি। কার্যাদেশ নিজেদের হাতে ধরে রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণ করত তারা। কিন্তু সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পুরনো অর্থবছরের সারের কার্যাদেশের মেয়াদ নতুন করে বাড়ানো হবে না। এতেই বিপাকে পড়েছে সিন্ডিকেটটি। গত অর্থবছরে তারা প্রায় ২৬ কোটি টাকার ডিও কিনেছিল।

জানা গেছে, মাঝিরঘাটের মিজানুর রহমান, জামাল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জামাল উদ্দিন, সুলতানা ট্রেডার্সের মালিক মো. আকরাম হায়দার, মান্না এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হারুন রশিদ মান্না ও রুবেল অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক মো. ইউসুফ খান মাহবুবের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ সিন্ডিকেট। তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ভর্তুকির ডিএপি সার বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি ‘৫ জনের থাবায় ভর্তুকির সার’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর বিসিআইসি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটিও সার সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব পেয়েছে। বিসিআইসি সে সময় এই সিন্ডিকেট ভাঙতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার ডিএপি কারখানার গেটে সার বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, সারা দেশে বিসিআইসির ২৪টি বাফার গোডাউনে সার পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখান থেকে প্রকৃত ডিলাররা সার বুঝে নেবে।

তবে এখন পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। এর মধ্যেই ওই সিন্ডিকেট সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা গত অর্থ বছরে প্রায় ১১ হাজার টন ডিএপি সারের ডিও ধরে রেখেছিল। সে সময় এর মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি টাকা। অধিক মুনাফা করতে তারা গত অর্থবছরের ডিওর মেয়াদ বাড়াতে চাইছে। এ জন্য নানা মহলে দেনদরবার শুরু করেছে তারা, মামলাও করেছে। কারণ এখন সেই সারের বাজারমূল্য হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি টাকা।

‘মাঝিরঘাট সার পরিবহন ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি’ ও ‘বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন’ মাঝিরঘাট শাখা নামে সার সিন্ডিকেটের দুটি সংগঠন রয়েছে। এতে সদস্যসংখ্যা ৭৫। জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর সার পরিবহন ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি জরুরি সভা করে। পরে বিসিআইসি ও মন্ত্রণালয়কে হাত করতে সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে ৫০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়।

তবে পুরনো অর্থবছরে বরাদ্দ করা ডিওর মেয়াদ না বাড়াতে বিসিআইসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে। গত ২৫ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার উপপ্রধান শেখ বদিউল আলমের সই করা চিঠিতে বিসিআইসিকে জানানো হয়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ করা সারের চাহিদা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তাই আগে বরাদ্দ করা সার সরবরাহ না করে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট ডিলারের অনুকূলে বরাদ্দ করা সার থেকে আগের সারের জন্য জমা করা টাকা সমন্বয় করতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

ডিএপি কারখানার এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, এ চিঠির অর্থ হলো, যাদের কাছে সারের বরাদ্দ আছে তারা অর্থ তুলে নিতে পারবে, কিংবা নতুন করে যখন বরাদ্দ পাবে তখন তার সঙ্গে জমা টাকা সমন্বয় করে নিতে পারবে। কিন্তু পুরনো কার্যাদেশ দিয়ে আর সার তোলা যাবে না। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়েছে ওই সিন্ডিকেট। এ চিঠির আদেশ ঠেকাতে তারা উচ্চ আদালতে মামলাও করেছে।

জানা গেছে, সিন্ডিকেটের অন্যতম পদ্মা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মিজানুর রহমানের ভাই রেজাউল করিম গত ২৫ জুলাই ওই চিঠির স্থগিতাদেশ চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। আদালত গত ২৪ আগস্ট চিঠির নির্দেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। তবে আদালতের আদেশ এখন পর্যন্ত বিসিআইসি ও ডিএপি কারখানায় পৌঁছেনি। এ কারণে ডিএপি কারখানা থেকে এখন পর্যন্ত গত অর্থবছরের মেয়াদোত্তীর্ণ ডিএপি সার ছাড় করা হয়নি।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন গতকাল বুধবার টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য আমরা সার বাফার গোডাউনে পাঠাতে চেয়েছিলাম, সেই সিদ্ধান্ত এখনো বলবৎ আছে। এ বিষয়ে আমাদের কাজ চলছে। সরকারের নির্ধারিত দামেই সব ধরনের সার বিক্রি করতে হবে, এটি আমাদের অঙ্গীকার। তা আমরা রক্ষা করবই। ’


মন্তব্য