kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিপ্লবীর দেশে

চের জন্য প্রতিবাদ

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চের জন্য প্রতিবাদ

মহান বিপ্লবী চে গুয়েভারা, যাঁর আদর্শের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজও দেশে দেশে গাওয়া হয় বিপ্লবের জয়গান।

কে করেছে এটা, জানেন? ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা নীরব, তবে চাহনিতে ঘৃণার তীব্র প্রকাশ। যেন অভিসম্পাত করলেন তাকে বা তাদেরকে, যারা চে গুয়েভারার ম্যুরালে লিখেছে, ‘খুনি’! প্রথম দেখায় রোজারিও অনেক কারণেই চমকে দেবে আপনাকে।

এই যেমন বিপ্লবী চে গুয়েভারা নিজের শহরেই মুখে চুনকালি মেখে দাঁড়িয়ে আছেন!

নামটা জানা হয়নি। তবে ছবির মতো; কিন্তু ছোট্ট শহর রোজারিওতে যে পার্কটা চে গুয়েভারার নামে, সেটিতে সবচেয়ে বেশি সময় কাটে তাঁরই। পার্কে একমাত্র দোকানটি, সংবাদপত্র বিক্রির স্টলের মালিক যে তিনিই। তাই কে বা কারা বাম বিপ্লবের অন্যতম মহানায়কের ম্যুরালে কালিমা লেপন করেছে, সেটি তাঁর জানা থাকতেও পারে; কিন্তু মুখ আর খুললেন না। ভাবটা এমন যে উচ্ছন্নে যাওয়া দেশে প্রতিবাদ করে আর কী লাভ! সঙ্গীর কাছ থেকে জানা গেল, ‘এখন তো ডানপন্থী সরকার দেশ চালাচ্ছে, তাই এ অবস্থা। ’ অবশ্য সে ম্যুরালে দেখলাম মই বসানো হয়েছে। জানা গেল, সেটি বসেছে ম্যুরাল থেকে ‘অ্যাসেসিনো’ শব্দটি মুছে ফেলার জন্য। মেসির জন্মভিটে দেখতে রোজারিওতে আসা। সেখানে তিনি ‘নেই’। বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী চে গুয়েভারার প্রতিও এমন অনীহা রোজারিওর!

ব্রাজিলে যেমন পর্তুগিজদের সংখ্যাধিক্য, তেমনি আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশরা প্রভাবশালী। বুয়েনস এইরেস থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের রোজারিও আদতে সান্তা ফে প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত একটি শহর মাত্র। কিন্তু রোজারিওবাসী গর্ব করে, তাদের শহরটাই সান্তা ফে’র রক্তনালি। বুয়েনস এইরেসের অধিবাসীদের কাছে রোজারিওর কদর আরো বেশি, এটিকে দেশটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নগরী মনে করে তারা। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি যেমন আছে, তেমনি জীবনাচারে কখনো কখনো টেক্কা দেয় ইউরোপ ঘরানার বুয়েনস এইরেসকে। আর্জেন্টাইনদের সর্বকালীন ভালোবাসা পেয়ে আসছেন যে নারী, সেই ইভা ডুরান্ট ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন বুয়েনস এইরেসে। আবার বুয়েনস এইরেস কিংবা পাশ্চাত্যের শিল্পীরা ফুরসত পেলেই বসে পড়েন রোজারিওর কোনো ক্যাফেতে, নিরিবিলিতে শিল্প চর্চার জন্য। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে যেমন শিল্পকলার মধ্যমণি সান্তা তেরেসা, তেমনি আর্জেন্টিনায় রোজারিও। দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মও রচিত এ শহরে। মোদ্দাকথা আর্জেন্টিনার প্যারিস এই রোজারিও।

রোজারিওর কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া অপূর্ব পারানা নদীর ওপাড়ে যে দ্বীপ সেখানে বসেই নীলাকাশ দেখে আকাশি-নীল পতাকা এঁকেছিলেন জেনারেল ম্যানুয়েল বেলগ্রানো। পেশায় সেনা কর্মকর্তা, তবে একাধারে অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদও ছিলেন তিনি। ১৮১২ সালের ফেব্রুয়ারি তাঁর নকশা করা পতাকাই প্রথম উড়েছিল রোজারিওতে। তেজি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার পতাকা হাতে বেলগ্রানোর ব্রোঞ্জমূর্তি এখনো এক পলক দেখতে বাধ্য করবে আপনাকে। আর্জেন্টিনার সব শহরেই প্লাজা দো মায়ো আছে, আনন্দ-আন্দোলন, সভা-সমিতির মূল মঞ্চ আরকি। রোজারিওর প্লাজা দো মায়োয় আছে বেলগ্রানোর সে মূর্তি । আর্জেন্টিনার সব শহরের মূল সড়কের নামই আবার সাঁ মার্তিন, স্বাধীনতার স্থপতিকে এ মর্যাদাটা দিয়ে রেখেছে লাতিন দেশটি। আর বীরত্বের মর্যাদায় সেই সাঁ মার্তিনের পরই আছেন বেলগ্রানো।

তাহলে চে গুয়েভারার স্বীকৃতি কোন স্তরে? রোজারিও দেখে বোঝা যায়, বর্তমান আর্জেন্টাইন সরকারের কাছে চে গুয়েভারা মার্কিনিদের মতোই অ্যালার্জিক। তবে জনমনে সেই আগের জায়গাতেই আছেন চে। ১ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রধান সব নগরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফেডারেল মার্চ। বুয়েনস এইরেসের সে মিছিলের দৈর্ঘ্য কত দূর আন্দাজ করতে পারিনি, তবে পুরো মিছিল সরে যেতে অন্তত ঘণ্টা দেড়েক তো অবশ্যই লেগেছে। তো, সেই মিছিলটি যথারীতি সরকারবিরোধী এবং তাদের অন্যতম দাবি কারারুদ্ধ নেত্রী মিলাগ্রো সালার মুক্তি। সপরিবারে, কোলে-কাঁখে বাচ্চাদের নিয়েও সর্বজনীন সে মিছিলের অন্যতম দাবি মিলাগ্রোর মুক্তি। তিনি বামপন্থী নেত্রী, তাই তাঁর মুক্তির মিছিলে অনেক পোস্টারে চে গুয়েভারার সেই অমর ছবি। কিউবান নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর অফিশিয়াল ফটোগ্রাফার আলবার্তো কর্দোবার তোলা ছবিটি ফটোগ্রাফি ইতিহাসেরই সবচেয়ে ব্যবহৃত ফ্রেম। চে গুয়েভারা যেমন দেশ ছাড়িয়ে বাম আন্দোলন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভীনদেশে, তেমনি কর্দোমার ‘গ্যারিলিরো হিরোইসো’ মানে, ‘নায়কোচিত গেরিলাযোদ্ধা’ ক্যাপশনের ছবিটাও ছাড়িয়ে গেছে ভৌগোলিক সীমানা। ফটো ফ্রেম থেকে শুরু করে টি-শার্টে, টুপিতে, গ্লাসে চে গুয়েভারার উদ্ধত সে ভঙ্গি। যে ছবির রি-প্রিন্ট কোথাও না কোথাও হয়তো এখনো হচ্ছে।

আর সেই চে গুয়েভারাই কিনা নিজের শহরে অসম্মানিত। বৃদ্ধা স্প্যানিশে বিড়বিড় করে কি যেন বললেন। সঙ্গী দোভাষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জানালেন, ‘কিছু মানুষ আছে, যারা সন্মান করতেই জানে না, অমানুষ সব!’ উন্নত, অনুন্নত সব দেশেই সম্ভবত কমবেশি এমন ‘অমানুষ’ রয়েছে।

ওই একটি ফ্রেম বাদ দিলে স্বমহিমাতেই আছেন মাত্র ৩৯ বছর বয়সে দেহান্তরে যাওয়া চে গুয়েভারা। রোজারিওর অভিজাত আবাসিক এলাকায় তাঁর জন্ম যে বাড়িতে, সেটিতে আজও আভিজাত্যের ছাপ। দুটি রাস্তার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতল এ ভবনে তাঁর পূর্ব কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের কেউ আর থাকে না, পুরো পরিবার উঠে গেছে কর্দোবায়। তবে এখনো বাড়ির মাথায় আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ে। রবিবার সকাল বলেই ঘুমন্ত শহরে কাউকে কাছাকাছি পাওয়া যায়নি। জানালার কাচ ভেদ করে নিচতলার ইন্টেরিয়র দেখে মনে হলো এটা কোনো কিউরিউ শপ এখন। বৈশ্বিক রাজনীতিকে এত অল্প সময়ে জোর ঝাঁকি দেওয়া মানুষটির ভিটায় স্মারকের দোকানই তো সবচেয়ে মানানসই! জাদুঘরও হতে পারত। তবে চে গুয়েভারার জন্য আস্ত একটা জাদুঘর আছে কর্দোবায়। সেখানেই তাঁর সেই মোটরবাইকটি বলে জেনেছি, যেটাতে চড়ে বাম বিপ্লবের গল্প চে গুয়েভারা ফেরি করেছেন লাতিন দেশগুলো থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকার কিউবা পর্যন্ত। এরপর আফ্রিকা ঘুরে বলিভিয়ায় তাঁর বিপ্লবের স্বপ্ন মুছে যায় মৃত্যুতে।

রোজারিওতে আলিশান বাড়িটি দেখে মনে হচ্ছিল আন্দোলনের পথে না হেঁটে একজন সফল মানুষের জীবনও তো যাপন করতে পারতেন তিনি। সে আমলের এ বাড়িতে অবস্থাপন্নদেরই থাকার কথা। চে নিজে ডাক্তারিও পড়েছিলেন। পাশাপাশি খেলাধুলাতেও পারদর্শী ছিলেন। শহরটির অন্যতম ক্লাব অ্যাতলেতিকো রোজারিও সেন্ট্রালের পাঁড় সমর্থক ছিলেন চে গুয়েভারা। মেসির শৈশবের ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাবকে আড্ডায় টেক্কা দিতে চে গুয়েভারার সমর্থনকে প্লাস পয়েন্ট হিসেবে তুলে ধরে রোজারিয়ানরা। সব মিলিয়ে আকর্ষক জীবনের সব উপসঙ্গই ছিল চে গুয়েভারার। তবু বিপ্লবের পথেই হেঁটেছেন তিনি। এ কারণেই মার্কসবাদ হারিয়ে গেলে লাখো হৃদয়ে বেঁচে আছেন চে গুয়েভারা, বেঁচে থাকবেনও।

সমাজ বদল কিংবা প্রভাব বিস্তারের মানদণ্ডে আর্জেন্টাইনরা আরেকজনকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। তিনি ইভা ডুরান্ট। অভিনেত্রী হওয়ার বাসনা নিয়ে ঘর ছেড়ে ছুটে এসেছিলেন বুয়েনস এইরেসে। সেখান থেকে সোজা রাজপ্রাসাদে ঠাঁই নেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে তাঁকে ঘিরে অনেক গল্পকাহিনী আছে। তবে সেসব ভুলে একদার ফার্স্ট লেডি ইভা পেরন এখনো আর্জেন্টাইনদের ভালোবাসার পাত্রী। ভাবা যায়, একজন ফার্স্ট লেডির শোকযাত্রায় অংশ নিয়েছে ৩০ লাখেরও বেশি জনতা! ইভা যেন প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হন, সে দাবিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনের স্কয়ারে জমায়েত হয়েছিল ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা চাননি। ভাইস প্রেসিডেন্ট মানেই স্বামীর মৃত্যুর পর ইভাই হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। প্রতাপশালী সামরিক বাহিনী সেটি চায়নি, কথিত আছে স্বয়ং হুয়ান পেরনও স্ত্রীর এমন জনপ্রিয়তা মেনে নিতে পারেননি। বাইরে জনতার প্রবল চাপ আর অন্দরমহলে চোখরাঙানি—পরে একটাই বেছে নিয়েছিলেন ইভা পেরন। নির্বাচনে আর অংশ নেননি তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে পরদিন রেডিওতে একটা মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী এভিটা ছবিতে ম্যাডোনার কণ্ঠে সুর হয়েছিল, ‘ডোন্ট ক্রাই ফর মি আর্জেন্টিনা’।

কিন্তু তারা এখনো কাঁদে নীরবে। ইংরেজিতে জুজুই হওয়ার কথা, তবে স্প্যানিশে উচ্চারণটা হুহুই। এ পাড়ার একটা ছোট্ট স্টোরের মালকিন সত্তুর ছুঁই ছুঁই মারিয়ার কাছে এভিটা (নামটা নিজেই ঠিক করেছিলেন ইভা পেরন) এখনো কাছের মানুষ, ‘ওকে মনে হতো আমাদেরই একজন, এত্ত সাধারণ ছিল। আমাদের কথা বলত। ’

চে গুয়েভারা যদি সমাজবদলে প্রভাব ফেলে থাকেন, তাহলে ইভা পেরন বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার সংবিধান। তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে পা রাখার আগে অদ্ভুত একটা আইন ছিল আর্জেন্টিনায়। পকেটে টাকা থাকলে যেকোনো পুরুষই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন। সে ঘরে সন্তান এলে বড়জোর পদবি ব্যবহারের অনুমতি দিলেই হতো, অধিকার নয়। বিত্তশালী হুয়ান ডুরান্ট যেমন আর কিছুই দেননি নিজের পদবি ছাড়া আর কিছুই দেননি ‘মিস্ট্রেস’-এর ঘরে জন্ম নেওয়া ইভাকে।

সে মর্মবেদনা থেকেই সম্ভবত বুয়েনস এইরেসে অভিনেত্রী হিসেবে টুকটাক নাম করার পরই নারী ও শিশু অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনীতিতে নাম লেখান ইভা ডুরান্ট। সে সূত্র ধরেই একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা হুয়ান পেরনের সঙ্গে পরিচয় এবং পরিণয়। অতঃপর নিজের মতো ভাগ্য বিড়ম্বিত শিশুদের অধিকারও নিশ্চিত করেন তিনি। থেকে যান আমজনতার একজন হয়েই। ভাঙা ইংরেজিতে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে মারিয়া বলে যান, ‘মি এভিতা, শি মারিয়া। ’

সামনের ধাবমান মিছিলের প্রতিটা চেহারাও অতি সাধারণ মানুষের। তবে সংখ্যা আর স্বতঃস্ফূর্ততায় অসাধারণ! মরিসিও মাক্রির ডানপন্থী সরকার এ ধাক্কা সামলাতে পারবে তো?

 


মন্তব্য