kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মৃত্যুবার্ষিকী

‘পোড়া গন্ধে’ আজ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণ

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘পোড়া গন্ধে’ আজ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুরসম্রাট আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন। ছবি : কালের কণ্ঠ

সংগীতাঙ্গনটিতে প্রবেশ করলে হাতের কাছেই পাওয়া যেত সুরসম্রাটের যতসব দুর্লভ স্মৃতিচিহ্ন। সুযোগ মিলত ওস্তাদজির ব্যবহৃত সরোদ, বেহালা, সন্তুর, এস্রাজ, ব্যাঞ্জো, সৌদি বাদশাহর দেওয়া জায়নামাজ, ভারতের মাইহার রাজ্যের রাজার দেওয়া গালিচা, বিভিন্ন সময়ে আত্মীয় ও শিষ্যকে দেওয়া নিজ হাতে লেখা চিঠি দেখার।

এক নারকীয় ঘটনায় সে সবই যেন চোখের আড়ালে চলে গেছে। তবে ওস্তাদজির মতো তাঁর স্মৃতিচিহ্নকেও মনের গহিনে গেঁথে রেখেছেন ভক্ত-অনুরাগীরা। তাইতো ভয়াবহ তাণ্ডবের পর সেই পোড়া গন্ধের মাঝে দাঁড়িয়েই আজ স্মরণ করা হবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে।

ওস্তাদজির ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে আজ আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। ভাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর হাত ধরে ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠা পায় এই প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি তাণ্ডব চালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সব স্মৃতিচিহ্ন। জীবদ্দশায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার কুমারশীর মোড়ের এই জায়গায় বসে সংগীতচর্চা করেছেন সুরসম্রাট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতিকর্মী ও আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১২ জানুয়ারির তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সংগীতাঙ্গনের অভ্যন্তরে থাকা জাদুঘরটির। আগুনে সেখানে থাকা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর দুর্লভ অনেক স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস হয়ে গেছে, যে ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। তবে আমরা চেষ্টা করছি জাদুঘরটি ফের চালু করার। স্থানীয় সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর প্রচেষ্টায় সংগীতাঙ্গনে ইতিমধ্যে ক্লাস শুরু করা হয়েছে। সংগীতাঙ্গনের অন্যান্য অবকাঠামোও কিছুটা ঠিক করা হয়েছে। ওস্তাদজির ব্যবহার্য কোনো জিনিস বা স্মৃতিচিহ্ন কারো কাছে যদি থেকে থাকে তাহলে আমাদের জাদুঘরে দেওয়ার জন্য বিনীতভাবে আহ্বান জানাচ্ছি। ’

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে বিখ্যাত এক সংগীতজ্ঞ পরিবারে, ১৮৬২ সালে। তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী ও সরোদবিশারদ। তাঁর বাবা সংগীতজ্ঞ সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁ এবং মা সুন্দরী বেগম। আলাউদ্দিন খাঁর ডাকনাম ছিল আলম। ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের মাইহারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।  

ছোটবেলায় অগ্রজ ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছে তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি সুরের সন্ধানে বাড়ি থেকে পালিয়ে এক যাত্রাদলের সঙ্গে যোগ দেন। একসময় তিনি চলে যান ভারতের কলকাতায়। শুরুটা গানে হলেও পরে তিনি ঝুঁকে পড়েন বাদ্যযন্ত্রের দিকে।

কলকাতায় গিয়ে তিনি প্রখ্যাত সংগীতসাধক গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সাত বছর সংগীত শেখার পর নুলো গোপালের মৃত্যু হলে আলাউদ্দিন খাঁ কণ্ঠসংগীতের সাধনা ছেড়ে যন্ত্রসংগীতে মনোযোগ দেন। অমৃতলাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের কাছে তিনি বাঁশি, পিকলু, সেতার, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। লবো সাহেব নামে এক ব্যান্ড মাস্টারের কাছে পাশ্চাত্য রীতিতে ও বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ অমর দাসের কাছে দেশীয় পদ্ধতিতে বেহালা শেখেন। এ ছাড়া তিনি সানাই, নাকারা, টিককারা, জগঝম্প, মৃদঙ্গ ও তবলায় তালিম নেন। এভাবে তিনি সর্ববাদ্যে বিশারদ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি সংগীতজগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সংগীত শেখাতে কারো কাছ থেকে তিনি বেতন কিংবা কোনো উপহারও গ্রহণ করতেন না।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৯১৮ সাল থেকে ভারতের মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। আলাউদ্দিন খাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনায় কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্রও উদ্ভাবিত হয়। সেতারে সরোদের বাদন প্রণালি প্রয়োগ করে সেতারবাদনে তিনি আনেন আমূল পরিবর্তন। এভাবে তিনি সংগীতজগতে এক নতুন ঘরানার প্রবর্তন করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। ভারত সরকার তাঁকে দেয় সর্বোচ্চ সম্মাননা পদক ‘পদ্মভূষণ’।

প্রসঙ্গত, এক মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরজুড়ে তাণ্ডব চালানো হয়। আক্রমণের শিকার হয় আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়।


মন্তব্য