kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা আব্দুর রহিম চলে গেলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক ও দিনাজপুর প্রতিনিধি   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা আব্দুর রহিম  চলে গেলেন

দিনাজপুর থেকে নির্বাচিত সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের পশ্চিম জোনের চেয়ারম্যান, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা এম আব্দুর রহিম (৯০)

ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল রবিবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন।

গতকাল বাদ আসর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ সোমবার তাঁর নিজ জেলা দিনাজপুরে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান এবং আরো দুই দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হবে। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারসহ বিভিন্ন ব্যক্তি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

এম আব্দুর রহিম স্ত্রী, চার মেয়ে ওই দুই ছেলেসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর বড় ছেলে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম সাবেক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছোট ছেলে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম। চার মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ে নাদিরা সুলতানা ও নাসিমা সুলতানা চিকিৎসক। অন্য দুই মেয়ে নাফিসা সুলতানা এবং নাজিলা সুলতানা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর বাবা বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগে ভুগছিলেন। গত ২ আগস্ট থেকে তিনি দিনাজপুরে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ১১ আগস্ট মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়। তিনি সর্বশেষ বারডেমের এইচডিইউ পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এম আব্দুর রহিম ১৯২৭ সালের ২১ নভেম্বর দিনাজপুর সদর উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করে দিনাজপুর জেলা আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত হন। রাজশাহী কলেজের শহীদ মিনার নির্মাণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে প্রচারাভিযানে অংশ নেন।

আব্দুর রহিম ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুজিবনগর সরকার তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের পশ্চিম জোনের চেয়ারম্যান-১ নিযুক্ত করে। ওই জোনের আওতায় ভারতে ১১২টি রিলিফ ক্যাম্প, ১২টি যুব অভ্যর্থনা শিবির, ছয়টি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পসহ একটি মুক্তিযোদ্ধা বাছাই ক্যাম্প গঠন করা হয়েছিল। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি দীর্ঘদিন দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন। ১৯৯১ সালে দিনাজপুর সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

শোক : রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শোকবার্তায় বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এম আব্দুর রহিমের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদকে হারাল। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় বলেন, তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক, আইনজীবী ও সমাজকর্মী এবং আওয়ামী লীগ একজন ত্যাগী নেতাকে হারাল। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এক শোকবার্তায় বলেন, আব্দুর রহিম ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। এ ছাড়া ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজসহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করেছেন।

জানাজা : এম আব্দুর রহিমের জানাজা গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় রাজনৈতিক সহকর্মী, গুণগ্রাহী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সর্বস্তরের নাগরিক অংশ নেন। এ সময় মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রথমে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এর আগে মরহুমের প্রতি রাষ্ট্রপতির পক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন তাঁর সামরিক সচিব। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও হুইপরা এবং বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মিলন শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন।

মরহুমের প্রতি আরেক দফা শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় জানাজা আজ অনুষ্ঠিত হবে তাঁর নিজ জেলা দিনাজপুরে। সকাল ১০টায় দিনাজপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন, ১১টায় গোর-এ শহীদ ময়দানে জানাজা, দুপুর ২টায় গ্রামের বাড়ি জালালপুর ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হবে। আওয়ামী লীগের পৌর কমিটির সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।


মন্তব্য