kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সচেতনতা

গানে-কবিতায় পাখিপ্রেম

রফিকুল ইসলাম, মঠবাড়িয়া থেকে ফিরে   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গানে-কবিতায় পাখিপ্রেম

পিরোজপুরের তেলিখালীতে রিভারভিউ ইকো পার্কে দর্শনার্থীদের মাঝে পাখি রক্ষায় সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেন পাখিপ্রেমী আবুল কালাম আজাদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘পাখির ডাকে সকাল হত/খুলতো মোদের আঁখি/আর ডাকে না আগের মত/আমার গ্রামে পাখি। ’—এক পাখিপ্রেমীর এই স্বরচিত কবিতা আর গানই বলে দিচ্ছে গ্রামে আগের মতো আর পাখি নেই।

যা আছে তা-ও শিকারিদের দৌরাত্ম্যে হারিয়ে যাচ্ছে। এমনই বাস্তবতায় গানে-কবিতায় পাখি রক্ষার ব্যতিক্রমধর্মী এই উদ্যোগ। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কয়েক শ শিক্ষার্থী গানে-কবিতায় পাখি রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। ফলে পাখি রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরি হচ্ছে। পাখি নিধন থেকে শুরু করে হাটবাজারে তা বিক্রিও কমে আসছে।

গানে-কবিতায় পাখির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার মহতী উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন যুবক আবুল কালাম আজাদ আকন। বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার উদয়তারা বুড়িরচর গ্রামে। পেশায় শিক্ষক এই পাখিপ্রেমীর অবসর সময়টা কাটে পাখিসেবায়। পাখি শিকার প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে তিনি পাখির অন্তত চারটি অভয়ারণ্য রক্ষা করে চলেছেন। পাখির প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি গান রচনা করছেন। কবিতাও লিখছেন পাখি নিয়ে। স্কুলে স্কুলে গিয়ে স্বরচিত সেই কবিতা পাঠ করে কোমলমতী শিশুদের পাখি রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে হাটবাজারে গিয়ে নিজ হাতে বিলি করছেন লিফলেট।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাখি পরিবেশের শুধু অনন্য বন্ধুই নয়, শান্তির প্রতীক। পাখির গান মানুষের নিঃসঙ্গতা আর দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেয়। নতুন করে বেঁচে থাকার উৎসাহ জোগায়। ফসলের উপকারিতার কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। সর্বোপরি পাখির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি ওদের রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য খুলনা আর বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন জাহিদুল কবির। তাঁর অনুপ্রেরণায় আবুল কালাম আজাদ স্বেচ্ছাশ্রমে পাখি রক্ষার কাজটি শুরু করেন। জাহিদুল কবির বর্তমানে ঢাকায় বন বিভাগে কর্মরত। মোবাইল ফোনে গত শনিবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজাদ দীর্ঘদিন ধরেই পাখি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছি। এমনকি তাঁর সহযোগিতায় জনসচেতনতামূলক সভাও করেছি। ’

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন ড. এ কে এম আবদুল আহাদ বিশ্বাস বলেন, ‘পাখি ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো ইকোসিস্টেমের পরিবর্তন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ক্রমান্বয়ে মানুষের আবাসস্থল সৃষ্টি, চোরাচালান আর শিকারের কারণেও কমে যাচ্ছে পাখির সংখ্যা। তা ছাড়া আবাদি জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগের ফলে কীটপতঙ্গ ধ্বংস হচ্ছে অধিক মাত্রায়। এই মৃত কীটপতঙ্গ খেয়েও মারা যাচ্ছে। আবার অনেক পাখি এর বিষক্রিয়ায় প্রজননক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।

তেলিখালীতে একদিন : আগেই মুঠোফোনে যোগাযোগ করে রেখেছিলেন ৩১ আগস্ট বুধবার যাবেন বরিশাল বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানীসাফা গ্রামে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে গত বুধবার বরিশাল থেকে রওনা হন এই প্রতিবেদক। উদ্দেশ্য সরেজমিনে স্কুল শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের পাখিপ্রেম দেখা। গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে যায়। স্কুলের প্রবেশপথের ডান দিকেই বিজ্ঞানাগারে চোখ আটকে যায় বাদ্যযন্ত্রের তালে। টেবিলের ওপর তবলা আর হারমোনিয়াম। স্কুলের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী সেই টেবিল ঘিরে গানচর্চায় ব্যস্ত।

উদয়তারা বুড়িরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিপুলকৃষ্ণ হালদার। শিক্ষকতার বাইরে তিনি শিশুদের গান শেখান। গান পরিবেশনের মাধ্যমে তিনিও আজাদের পাখি শিকার প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তেলিখালী স্কুলের বিজ্ঞানাগারে তিনিই শিক্ষার্থীদের সুরে সুরে গান শেখাচ্ছিলেন। শিক্ষার্থীরা তাঁরই শেখানো সুরে তাল মিলিয়ে গাইছে—‘পাখির ডাকে সকাল হত/খুলতো মোদের আঁখি/আর ডাকে না আগের মত/আমার গ্রামে পাখি। ’

মাত্র ৩০ মিনিটের চেষ্টায় শিক্ষার্থীরা পুরো গানটি সুরের সঙ্গে রপ্ত করে ফেলে। মহড়ার পর বিপুলকৃষ্ণ হালদার শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলের খোলা মাঠেই গান ধরলেন। তাদের ঘিরে জড়ো হতে থাকল অন্য শিক্ষার্থীরা। গান থামার পর পাখি শিকার রোধে সচেতনতামূলক বক্তব্য দিলেন আজাদের আরেক সহযোদ্ধা মোস্তফা কামাল খান। পেশায় শিক্ষক মোস্তফা কামাল পার্শ্ববর্তী সাফা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। তাঁর বক্তব্যের পরই পাখি নিয়ে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন আবুল কালাম আজাদ। চারপাশে পাখির প্রচুর খাবার, তার পরও ক্ষুধার্ত পাখির ছানা খাবার পাচ্ছে না। কারণ পাখির সেই খাবারে ভাগ বসিয়েছে মানুষ। মা পাখি আর তার ছানার মধ্যে খাবার সংকট নিয়ে কথোপকথন উঠে এসেছে কবিতায়।

কবিতা, গান আর পাখির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য শেষে আজাদ উপস্থিত ২০০ শিক্ষার্থীকে শপথবাক্য পাঠ করালেন পাখি শিকার প্রতিরোধে। কর্মসূচি শেষে বাড়ি ফেরার পথেও শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে আজাদের সচেতনতামূলক গান। এ প্রসঙ্গে একাধিক শিক্ষার্থীর মন্তব্য—‘গানের কথাগুলো সত্যি; এত দিন না বুঝে পাখি মেরেছি। এখন থেকে পাখি রক্ষা করব। শিকারিরা যাতে পাখি না মারতে পারে সে ব্যাপারে সচেতন হব। ’  

পাখি রক্ষায় যত উদ্যোগ : শুধু গান আর কবিতায় নয়, পাখি রক্ষায় আজাদ ব্যতিক্রমধর্মী বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। পাখি রক্ষার আহ্বান জানিয়ে তিনি মঠবাড়িয়া আর ভাণ্ডারিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী তেলিখালী, ধানীসাফা আর তুষখালী ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছেন। হাটের দিন আজাদ নিজেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনে জনে লিফলেট বিতরণ করছেন। আর সেই লিফলেটে উল্লেখ থাকছে পাখি রক্ষার ৬২টি প্রয়োজনের কথা। লিফলেটে আজাদের মোবাইল ফোন নম্বরও দেওয়া আছে। পাখি শিকারের ঘটনা ঘটলেই ওই নম্বরে ফোন জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। রয়েছে পাখি ধ্বংসের কারণ। সেই ধ্বংসের হাত থেকে পাখি কিভাবে রক্ষা করা যায় তারও উপায় বলা আছে লিফলেটে। এর পাশাপাশি স্কুল-কলেজ আর গ্রামে গ্রামে পাখি শিকার প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাখির অভয়ারণ্যে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পাখি মারতে নিষেধ করা হয়েছে।

অভয়ারণ্যের খোঁজে : তখন শেষ বিকেল। উদ্দেশ্য আজাদের তত্ত্বাবধানে থাকা অভয়ারণ্যগুলো ঘুরে দেখা। আজাদ জানান, তেলিখালী ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কচা নদী। এই নদীতীরের একটি গ্রাম হরিণপালা। সেই হরিণপালা রিভারভিউ ইকো পার্ক লাগোয়া চর এলাকায় শীত মৌসুমে অতিথি পাখি আসে। তবে হরিণপালা গ্রামের ফরাজিবাড়ীর বাঁশঝাড়ে সাদা বকের দেখা মেলে প্রতিদিন। ধানীসাফা ইউনিয়নের তিত্রা গ্রামের হাওলাদার বাড়ির বাঁশবাগানে দেখা যায় দুধবক। তুষখালী গ্রামের নিউ মার্কেট এলাকার বড় বড় গাছে দেখা মেলে শালিক, বাদুড় আর কাকের।

যেতে যেতে আজাদ বলতে থাকেন, ‘শীত মৌসুমে গ্রামবাংলার এই পথ দিয়ে হেঁটে যেতে ঘুঘুর সুরেলা কণ্ঠ কানে ভেসে আসে। তিলা ঘুঘু অতি পরিচিত পাখি, গ্রামের মাঠে-ঘাটে, শস্যভিটায় এদের দেখা মেলে। কখনো সুনিবিড় কোনো পথে ঘুঘু পাখি একাকী বা জোড়ায় জোড়ায় হেঁটে হেঁটে মাথা দুলিয়ে শস্যদানা খুঁজে বেড়ায়। মানুষের আভাস পেলে একটু থমকে দাঁড়ায়, তারপর দেখেশুনে আবার হাঁটতে শুরু করে। মানুষের দূরত্ব যদি নিরাপদ সীমার বাইরে চলে যায়, তখন ডানা ঝাপটে উড়াল দেয়। ’

আজাদ জানান, ২০১৩ সালের ৮ নভেম্বরের ঘটনা। কাঠের মমিন মসজিদের আশপাশের গ্রামের ক্ষেতে ক্ষেতে রাজাসাইল ধান। সেই ক্ষেতে ফাঁদ পেতে বেশ কিছু ঘুঘু শিকার করে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে তিনি মঠবাড়িয়া বন বিভাগের সহযোগিতায় ঘুঘুসহ পাঁচ শিকারিকে ধরে ফেলেন। পরে প্রত্যেককে ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ঘুঘুগুলো অবমুক্ত করা হয়। তাঁদেরই একজন ইয়ামিন শিকদার। তিনি বলেন, ‘তখন ছোট ছিলাম, না বুঝে পাখি শিকার করেছি। এখন শিকার তো করিই না, অন্য কেউ করলে তাতে বাধা দিই। আজাদ ভাই এই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছেন। ’

গাছে গাছে বকফুল : আজাদের কথা চলতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি এই প্রতিবেদককে নিয়ে পৌঁছে যান তুষখালীর নিউ মার্কেট এলাকার মজিবুর রহমান ওরফে মন্টু মাস্টারের বকবাড়িতে। বাড়িতে ঢোকার মুখেই বুনো গন্ধ এসে নাকে লাগে। পাখি ও বিষ্ঠার তীব্র গন্ধ এবং পাখির কলকাকলি বুঝিয়ে দেয়, এটি মানুষের পাশাপাশি পাখিদেরও বাড়ি। মানুষ ও পাখির সহাবস্থানে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক পরিবেশের এক বাসভূমি।

বাড়ির উত্তর দিকে পোনা নদী আর দক্ষিণে খোলা প্রান্তর (ধানক্ষেত)। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি কাঠের ঘর। যেন গাছের সঙ্গে গলাগলি করে বেড়ে ওঠা আবাস। ঘরের চারদিকে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, রেইনট্রিসহ চেনা-অচেনা নানা জাতের গাছ। প্রজনন মৌসুমে সেসব গাছে বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন প্রজাতির সাদা বক। গাছের ডালের ফাঁকে ফাঁকে পাখির বাসা। সেই বাসাগুলোতে কিচিরমিচির করছে বকের বহু ছানা। মা পাখি দূরে কোথাও থেকে খাবার নিয়ে বাসায় ফিরতেই ছানার দল বাসার মধ্যে নড়েচড়ে উঠছে। বাসা থেকে বেরিয়ে ডালে বসছে। মা পাখি হাঁ করা মুখের ভেতর ঠেলে দিচ্ছে আহার।

মা পাখির উড়ে আসা, ছানার মুখে খাদ্য তুলে দেওয়া আর ওদের কিচিরমিচির শব্দের এমন দৃশ্য প্রায় দিনভর চলে বলে জানান বাড়ির মালিক মজিবুর রহমান মন্টু।

বেলা গড়িয়ে তখন পশ্চিম দিগন্তে নেমে গেছে। আজাদের ঝুলিতে থাকা পাখি নিয়ে গল্পও বুঝি ফুরিয়ে আসছিল। ঠিক এমন সময়ই দেখা গেল, নানা প্রান্ত ঘুরে পাখিরা আপন ঠিকানা মন্টু মাস্টারের বাড়িতে ফিরে আসছে। গাছে গাছে পাখির উপস্থিতি বাড়ছে। গোধূলির রংমাখা গাছে গাছে যেন সাদা বকফুল ফুটছে। আর তা কেবলই বাড়ছে।


মন্তব্য