kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বড়পুকুরিয়ার ৮ গ্রামে পানির জন্য হাহাকার

বিদ্যুৎকেন্দ্রে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা গোয়েন্দাদের

আরিফুজ্জামান তুহিন   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বড়পুকুরিয়ার ৮ গ্রামে পানির জন্য হাহাকার

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় ১৩০ ফুট গভীরেও পানি মিলছে না। ফলে ওই এলাকার অন্তত আট গ্রামের মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে।

পানির সংকটে পড়া ১৪ গ্রামের মধ্যে ছয় গ্রামে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ শুরু হলেও অন্য আট গ্রামে সংকট নিরসন হয়নি। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এলাকাবাসী এ সংকটের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডকে দায়ী করছে। আর এ কারণে যেকোনো সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে অপ্রত্যাশিত ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো প্রতিবেদনে এমনটিই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক ১২৫ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০০৬ সাল থেকে উৎপাদনে আছে। এর পর থেকেই ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো ওই প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। গত ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (১২) ফরিদ আহাম্মদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘আগামী এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সমন্বয়ে যৌথভাবে বরাদ্দ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। ’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ চিঠি বিদ্যুৎসচিব মনোয়ার ইসলাম ও জ্বালানিসচিব নাজিমউদ্দীন চৌধুরীকে পাঠানো হয়।

এক মাসের মধ্যে পানি সংকট সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও বিদ্যুৎ বিভাগ বা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এখন পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া এলাকার মানুষের খাবারের পানির সংকট দূর করতে কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কম্পানিসচিব আবুল কাশেম প্রধানিয়া টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো দিকনির্দেশনা আমরা পাইনি। ’

পানির অভাবে ফুঁসছে গ্রামবাসী গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ইছাবপুরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০০৬ সালে উৎপাদন শুরু করে। এটি উৎপাদন শুরুর পর থেকেই কেন্দ্রের আশপাশের ১৪ গ্রামে তীব্র পানি সংকট দেখা যায়। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার ছয় গ্রাম—উত্তর শেরপুর, দক্ষিণ শেরপুর, দুধিপুর, মধ্যরামভদ্রপুর, মধ্যদুর্গাপুর ও কালুগ্রাম। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া খনি এলাকার আশপাশের আট গ্রামের মানুষও তীব্র পানি সংকটে পড়ে। এ আটটি গ্রাম হলো—বৈগ্রাম, কাশিয়াডাঙ্গা, মোবারকপুর, পাতিগ্রাম, বৈদ্যনাথপুর, বাঁশপুকুর, শাহগ্রাম ও চৌহাটি। এসব গ্রামে গ্রীষ্মকালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতই নিচে নেমে যায় যে নলকূপ দিয়ে তা উত্তোলন করা যায় না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে স্থানীয় জনগণ পানির দাবিতে আন্দোলনে নামে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি বুঝতে রুরাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটিকে (আরডিএ) সমীক্ষার দায়িত্ব দেয়। আরডিএ সমীক্ষা করে দেখতে পায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন ছয় গ্রামের মধ্যে চার গ্রামে ভয়াবহ পানি সংকট রয়েছে। এ চার গ্রাম হলো—দধিপুর, মধ্যরামভদ্রপুর, উত্তর শেরপুর ও দক্ষিণ শেরপুর আর বাকি দুই গ্রাম মধ্যদুর্গাপুর ও কালুগ্রামের মানুষ শুধু গ্রীষ্মকালে পানি সংকটে পড়ে। এ এলাকায় আরডিএ এক কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি গভীর নলকূপ ও পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে ইছাবপুরের ছয় গ্রামে পানি সরবরাহ শুরু করে।

তবে কয়লাখনিসংলগ্ন আট গ্রামে পানি সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। এর ফলে ২০১১ সাল থেকে আবারও আন্দোলন শুরু করে পানি, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থান আদায় কমিটি। এ সময় আন্দোলনকারীরা ইছাবপুরে ছয় গ্রামের মতো পানি সংকটে থাকা আটটি গ্রামেও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের দাবি জানায়। তবে এখন পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান হয়নি। আর এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই প্রতিষ্ঠান একে অপরকে দুষছে বড়পুকুরিয়া এলাকার ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সরকারের দুই কর্তৃপক্ষ একে অপরকে দুষছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের দাবি, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার জন্য তারা দায়ী নয়, মূলত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কর্তৃপক্ষের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অন্যদিকে কয়লাখনি কর্তৃপক্ষের দাবি, সুপেয় পানির স্তর ৮০ থেকে ১২০ ফুট গভীরে। খনি কর্তৃপক্ষ কয়লা উত্তোলনের জন্য মাটির এক হাজার ৫০০ ফুট গভীর থেকে পানি তুলছে, যা কোনোভাবে ৮০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতার পানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। তবে সরকারের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, দায়ী যে কর্তৃপক্ষই হোক—প্রকল্প এলাকায় দ্রুত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে না পারলে জনগণ যেকোনো মুহৃর্তে ফুঁসে উঠতে পারে।

জানা গেছে, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১৪টি অতি গভীর নলকূপ দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ লাখ লিটারের বেশি পানি উত্তোলন করা হয়। অধিক পানি উত্তোলনের কারণেই ২০০৯ সাল থেকে এ অঞ্চলের ভূগর্ভের পানি সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে স্থানীয় লোকজনের খাবার পানিও মিলছে না।


মন্তব্য