kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এবার জামায়াতকে শুকিয়ে মারার ব্যবস্থা নিন

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এবার জামায়াতকে শুকিয়ে মারার ব্যবস্থা নিন

রাত ৮টায় এ লেখা যখন লিখতে বসেছি তখন একাত্তরের বদর বাহিনীর কমান্ডার, জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা, বর্তমান জামায়াতের অর্থসাম্রাজ্যের প্রধান স্তম্ভ মহাবিত্তশালী টাইকুন, চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও হত্যার সরাসরি নির্দেশদাতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সর্বমোট ৪৫ জন আত্মীয়স্বজন এসেছিলেন শেষ দেখা করতে।

তাঁদের মধ্যে মোট ৩৮ জনকে কাশিমপুর কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে মীর কাসেমের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ৬টা ৩৫ মিনিটে সাক্ষাৎ শেষে তাঁরা ফিরে গেছেন। এর আগে জামায়াত ও বিএনপির অন্য শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির আগে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো যেভাবে সরাসরি সংবাদ প্রচার করেছে, এবারে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করেছি। তার একটি কারণ হয়তো এই যে ফাঁসি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হচ্ছে না। কেরানীগঞ্জে সেই কারাগার স্থানান্তরিত হওয়ার পর এই প্রথম ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে কাশিমপুর কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে দণ্ড কার্যকর হবে। দূরত্বের এই কারণ ছাড়াও গত ১ জুলাই হলি আর্টিজানে নারকীয় জঙ্গি আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞের সময় টিভি চ্যানেলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত সমপ্রচার কিংবা এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের অযাচিত চলতি বর্ণনা যেভাবে সমালোচিত হয়েছিল, তারপর সম্ভবত স্বনিয়ন্ত্রণ ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ উভয়ের প্রয়োগে মীর কাসেমের ফাঁসির খবর প্রচারে এবারে আমরা পরিমিতিবোধ দেখছি। শেখার বা দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার আসলে শেষ নেই। নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান তার স্বাক্ষর রাখছে। আর হয়তো কয়েক ঘণ্টা। ফাঁসি কার্যকর হবে। একাত্তরের ঘাতক মীর কাসেম আলী কি স্বপ্নেও তা কখনো ভেবেছিল? যে দেশ তারা দখল করে নিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে। মুক্তিযোদ্ধা নামধারী জেনারেল জিয়াউর রহমানকে প্রথমে এবং পরে জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সামনে রেখে পরাজিত পাকিস্তানের দালাল জামায়াতে ইসলামী ও ধর্মভিত্তিক দল ও গোষ্ঠীর এজেন্ট যারা রাষ্ট্র প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষায়তন, মিডিয়া এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মীর কাসেমের ভাবনায়ও আসার কথা নয়, তার ফাঁসি হবে এই বাংলায়। জীবন বাঁচাতে তার দেওয়া ২০০ কোটি টাকার মার্কিন ও ইউরোপীয় লবিস্টরা ব্যর্থ হবে। ব্যর্থ হবে মার্কিন প্রশাসন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সৌদি আরবের বাদশাহ বা তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান এবং এ দেশে জামায়াতকে রক্ষাকারী খালেদা জিয়া ও তাঁর দল বিএনপি। এক এক করে তুরুপের সব তাস ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। তা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের অতিসাধারণ মানুষের অনিঃশেষ মনোবল, বহু নদী রক্তে কেনা বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নামটির প্রতি গভীর মমতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আস্থা আছে এমন রাজনৈতিক শক্তির শক্তিশালী ঐক্যে। আমাদের অশেষ সৌভাগ্য যে এ সব কিছুর সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছিল কঠিন বিপদে কাণ্ডারি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ও অনমনীয়, প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের কাছে তিনি নিজেকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে পরাশক্তি বাংলাদেশের ব্যাপারে নাক গলাতে দুবার চিন্তা করে। সে কারণেই ব্যর্থ হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীদের নানা নীলনকশা।

এখন রাত সাড়ে ৯টা। স্ক্রলে দেখলাম লাশবাহী গাড়ি এসেছে কারা চত্বরে। প্রশ্ন হলো একাত্তরের এই ঘাতকের ফাঁসির পর তার অর্থসাম্রাজ্যের কী হবে? জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থ প্রতিষ্ঠানের কী হবে? এসব প্রশ্নে সরকারের খুব বেশি মাথাব্যথা আমরা লক্ষ্য করিনি। এ ক্ষেত্রেও আবার তাকাতে হবে আমাদের কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। যে অবিচল চিত্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ আপনি এগিয়ে নিয়ে এসেছেন, তা কার্যকর করছেন, সেই একই চিত্তে ও দৃঢ়তায় আপনি জামায়াতের ওপর নির্ধারক আঘাতটি হানুন। তাদের অর্থসাম্রাজ্যের ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জারি করে এদের শুকিয়ে মারার ব্যবস্থা নিন। বাংলার মানুষের বহু রক্ত এরা চার দশক ধরে শুষে নিচ্ছে। এবার তার উল্টোটা হোক। তাহলে কেবল জঙ্গি অর্থায়নের পথ বন্ধ হবে। অপার শান্তি-মানবিকতা ও অব্যাহত প্রগতির দেশ হবে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার সিংহদ্বারে পৌঁছে যাবে এ দেশের ওই সব মানুষ, যারা এ দেশ সৃষ্টি করেছে শুধু নয়, তাকে বুক আগলে রক্ষাও করছে।            

লেখক : অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য