kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাড়িওয়ালারা নির্বিকার ভোগান্তি ভাড়াটিয়ার

ফারজানা লাবনী   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাড়িওয়ালারা নির্বিকার ভোগান্তি ভাড়াটিয়ার

বাড়িওয়ালাদের রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে বাড়িভাড়া ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেওয়ার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি আইন করেছিল। এতে প্রকৃত আয়ের তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন কিছু বাড়িওয়ালা।

আইনটি পরিবর্তনে কিছু রাজনীতিবিদ, বর্তমান ও সাবেক আমলা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী বাড়িওয়ালারা একজোট হন। সমাজের প্রভাবশালী এসব ব্যক্তি রাতারাতি গড়ে তোলেন বাড়িওয়ালাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ হোম অ্যান্ড ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’। এ সংগঠনের ব্যানারে দেনদরবারে কাজও হয়। আইনটি বাস্তবায়নের ২১ দিনের মাথায় তা পরিবর্তনে বাধ্য হয় এনবিআর। যদিও এ আইন পরিবর্তন করা হলেও বাড়িওয়ালাদের নিয়ন্ত্রণে আইন করা আছে পাকিস্তান আমল থেকেই। ১৯৯১ সালেও একটি আইন হয়েছে। সম্প্রতি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নজরদারির অংশ হিসেবে ঘরে ঘরে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জেরার মুখেও পড়তে হচ্ছে ভাড়াটিয়াদের। তবে আকাশছোঁয়া ভাড়া নিয়ে কিংবা যখন তখন ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়িয়ে ভাড়াটিয়াকে চরম ভোগান্তিতে ফেললেও কৌশলে এসব আইন থেকে নিজেদের আড়ালের ব্যবস্থা করে রাখেন বাড়িওয়ালারা। মাস গেলেই নির্বিকার ভঙ্গিতে ভাড়ার জন্য তাগাদা শুরু করেন তাঁরা।  

যখন তখন ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানো বন্ধে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৯১ সালে করা হয় বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন। আইন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে সমঝোতা হতে হবে, দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো যাবে না; সহনীয় পর্যায়ে ভাড়া বাড়াতে হবে, ভাড়া নির্ধারণের চুক্তি ভাড়াটিয়াকে সরবরাহ করতে হবে; জোর করে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না, ভাড়া দিতে দেরি হলে দুর্ব্যবহার করা যাবে না। আইন অমান্যকারী বাড়িওয়ালার জন্য অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে রাজধানীর ধানমণ্ডি, উত্তরা, মিরপুর, সেগুনবাগিচা, ফার্মগেট, গুলশান এলাকায় বিভিন্ন বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃত তথ্য উল্লেখ করে ভাড়াটিয়াকে চুক্তি সরবরাহের ঘটনা নেই বললেই চলে। ভাড়া বাড়ানো সম্পূর্ণ বাড়িওয়ালার মর্জির ওপর নির্ভর করে। ভাড়া দিতে দেরি হলে ভাড়টিয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা না করে বাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে নামিয়েও দেওয়া হয়।  

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হালনাগাদ তথ্য অনুসারে গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া প্রায় ৪০০ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২৭ শতাংশের বেশি বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। জোর করে ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় ১৯ শতাংশ বাড়িওয়ালা।

ক্যাব সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে রাজধানীর শংকর এলাকায় ভাড়া থাকতেন এক নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর আর্থিক অনটনে দুই মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া পড়ে তাঁর। এতে বাড়িওয়ালা তিন সন্তানসহ তাঁকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেন।  

এমন ঘটনা রাজধানীসহ বাংলাদেশের অনেক শহরেই দেখা যায়। বাড়িভাড়ার প্রকৃত তথ্য ভাড়াটিয়াকে সরবরাহ না করায় ভাড়াটিয়ারা বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাড়িওয়ালাদের ভাড়ার প্রকৃত তথ্য জানতে এনবিআরের প্রণীত আইনটি অনুমোদনের ২১ দিনের মাথায় তা সংশোধন করা হয়। সে সময় সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, বাড়িওয়ালাদের অনেকেই সমাজের প্রভাবশালী। তাই ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া আদায়ে আইন করে বাড়িওয়ালাদের ওপর নজরদারি সম্ভব হয়নি।

২০১৩ সালের শুরু থেকেই বাড়ির মালিকদের ওপর নজরদারি শুরু করে এনবিআর। এনবিআর কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স কমিটি। কমিটির কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাড়িওয়ালাদের টিআইএন ও আয়কর রিটার্ন সম্পর্কিত কাগজপত্র যাচাই করেন। লোকবলের অভাবে মূলত বিভাগীয় শহরে সীমিত আকারে এ অভিযান সীমাবদ্ধ ছিল।

এক বছরের অভিযানে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১১ লাখ বাড়িওয়ালার তথ্য যাচাই করা হয়। এর মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি বাড়ির মালিকদের টিআইএন নেই বলে জানা যায়। তদন্তে দেখা যায়, টিআইএনধারী বাড়িওয়ালাদের অর্ধেকের বেশিই আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি।

অভিযান থেকে পাওয়া প্রতিবেদন নিয়ে এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বাড়ির মালিকদের আয়-ব্যয় নজরদারিতে আনার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়িভাড়া ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়। এর পরপরই ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তৎকালীন কমিটির সহসভাপতি হেলাল উদ্দিনকে সভাপতি করে ‘বাংলাদেশ হোম অ্যান্ড ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ গড়ে তোলেন প্রভাবশালী বাড়িওয়ালারা। এ সংগঠনের ব্যানারে তাঁরা আইনটি পরিবর্তনের দাবি করতে থাকেন। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ তৎকালীন অনেক আমলাও এ ব্যাপারে সোচ্চার হন। কিছু রাজনীতিবিদও যোগ দেন তাতে। এ বিষয়ে এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আইনটি করা হয়েছে, তবে হয়তো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারব না। সংশোধন করতে হবেই। বাড়ির মালিকরা অনেক ক্ষমতাবান। ’ 

শেষ পর্যন্ত ২১ দিনের মাথায় আইনটি পরিবর্তন করে ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয় এনবিআরকে। সংশোধিত আইনে বলা হয়, কেউ ইচ্ছা করলেই কেবল ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া গ্রহণ করতে পারবে। তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড়িওয়ালাদের নজরদারিতে আনা হলে রাজস্ব আয় কয়েক গুণ বাড়বে। তবে তা খুব কঠিন কাজ। কারণ তাঁদের ওপর নজরদারির কেউ নেই বললেই চলে। তাঁদের অধিকাংশই আমাদের সমাজের অভিভাবক। ’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ যেমন জরুরি, তেমনি বাড়িওয়ালাদের তথ্য সংগ্রহও জরুরি। তবে সমাজের নীতিনির্ধারকদের অনেকে বাড়ির মালিক হওয়ায় তাঁরা নিজেদের আড়াল করে রাখার সুযোগ তৈরি করে রাখেন।


মন্তব্য