kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আয়লানের মৃত্যুর এক বছর

যুদ্ধ বন্ধের ফরিয়াদ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যুদ্ধ বন্ধের ফরিয়াদ

 সৈকতের ভেজা বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে একটি শিশু। তার পরনে লাল টি-শার্ট, নীল প্যান্ট।

ছোট্ট দুটি পায়ে কালো রঙের জুতা। ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর তুরস্কের আলোকচিত্রী নিলুফার দেমিরের ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই শিশু আয়লান কুর্দি; যে কি না মা-বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে পালিয়ে তুরস্ক হয়ে নৌকায় করে গ্রিস যেতে চেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ ঢেউয়ের তোপে পড়ে সেই নৌকা ডুবে যায় ভূমধ্যসাগরে। বাবার হাত ফসকে পানিতে তলিয়ে যায় দুই ছেলে—তিন বছর বয়সী আয়লান ও পাঁচ বছর বয়সী গালিব। সাগর কেড়ে নেয় তাদের মা রেহানাকেও। প্রাণে বেঁচে যান বাবা আবদুল্লাহ। ওই দিনই স্রোতে ভাসতে ভাসতে আয়লানের নিথর দেহ ঠেকে তুরস্কের উপকূলে। সেই ছবি প্রচারের পর দুনিয়াজুড়ে সৃষ্টি হয় আলোড়ন। মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিবেক। বড় ধরনের ঝাঁকুনি খায় অভিবাসন-সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ইউরোপ।

আলোচিত সেই সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির মৃত্যুর ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো গতকাল শুক্রবার। কিন্তু এখনো বন্ধ হয়নি সিরিয়ায় যুদ্ধের বিভীষিকা। সম্প্রতি আয়লানের মতোই বিপন্ন মানবতার প্রতীক হয়ে সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল আরেক সিরীয় শিশু ওমরান। হামলার পর হতভম্ব বাস্তবতায় পড়া সেই শিশুটি অবশ্য প্রাণে বেঁচে আছে। দেশটিতে প্রতিনিয়ত চলছে গোলাগুলি, বোমা বর্ষণ। এখনো প্রাণ হারাচ্ছে অনেকে। আতঙ্কে এখনো শরণার্থী হচ্ছে সিরীয়রা। পুরো পরিবার হারানোর দিনটিতে শরণার্থীদের হয়ে তাই বিশ্ব নেতাদের প্রতি যুদ্ধ বন্ধের আকুল আবেদন জানালেন আয়লানের বাবা আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে অসহায় শরণার্থীদের জন্য দুয়ার খুলে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি।   

বর্তমানে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত আব্দুল্লাহ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিশ্ব নেতারা চাইলেই সিরিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবেন বলে তিনি এখনো বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই আমি তাদের (পরিবার) কথা ভাবি। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে যেন তারা আমার কাছে চলে এসেছে, আমার সঙ্গে ঘুমাচ্ছে। আর তা আমাকে আবারও ব্যথিত করে তুলছে। ’

স্ত্রী ও দুই সন্তানকে সিরিয়ার কোবানিতে সমাহিত করা হয়েছিল বলে জানান আবদুল্লাহ। তিনি জানান, দুর্ঘটনার দিনই আয়লানের মরদেহ ভেসে আসে তুরস্কের একটি সৈকতে। এর ১০০ মিটার দূরে পড়ে ছিল গালিবের মরদেহ। কাছের আরেকটি সৈকতে পাওয়া গিয়েছিল রেহানার মরদেহ।

আয়লানদের মৃত্যুর পর শরণার্থীদের ব্যাপারে বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘শুরুতে শরণার্থীদের সহায়তা করা হবে কি না তা নিয়ে বিশ্ব উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু তা এক মাসও স্থায়ী হয়নি। সত্যিকার অর্থে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হচ্ছে এবং আরো বেশি মানুষ দেশ ছাড়ছে। আমি আশা করি বিশ্বের সব নেতা মিলে যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন, যাতে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। ’

বিবিসি জানায়, ২০১৫ সালে ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী ও অভিবাসন প্রত্যাশী তুরস্ক থেকে ইউরোপে পৌঁছেছে। তবে ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার সময় নৌকাডুবিতে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আয়লান কুর্দিসহ আরো চারজনের মৃত্যুর জন্য দায়ী করে গত মার্চে দুই সিরীয় নাগরিককে চার বছর করে কারাদণ্ড দেন তুরস্কের আদালত।


মন্তব্য