kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বইপড়া কর্মসূচি

আলোকিত তারুণ্যের হাসি

নওশাদ জামিল   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আলোকিত তারুণ্যের হাসি

শিল্পকলায় গতকাল বইপড়া উৎসবে পুরস্কারের বই হাতে কলেজ শিক্ষার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গতকাল শুক্রবার সকালটা রাজধানী ঢাকার চিত্রটা ছিল বরাবরের মতোই। রাজপথে ছিল না ব্যস্ততা।

সর্বত্র ছুটির আমেজ। তবে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আসতেই দেখা গেল রাজ্যের ব্যস্ততা। গেটের সামনে বিভিন্ন কলেজের বাস দাঁড়িয়ে। বাস থেকে উল্লাস করতে করতে নামছে তরুণ-তরুণীরা। সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই প্রাঙ্গণজুড়ে দেখা যায় তারুণ্যের জটলা।

সবার মাঝে উচ্ছলতা, মুখে বিজয়ের হাসি। ওদের কেউ এসেছে দল বেঁধে, কেউ বা অভিভাবকের হাত ধরে। কারো পরনে কলেজের ইউনিফর্ম, কারো পরনে রঙিন পোশাক। সারিবদ্ধভাবে প্রত্যেকেই বসেছে জাতীয় চিত্রশালার বিশাল মিলনায়তনে। তারুণ্যের সেই জটলা থেকেই ক্ষণে ক্ষণে উঠছে উল্লাস-উচ্ছ্বাসধ্বনি। এমনই মনোমুগ্ধকর পরিবেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। রাজধানীর ১৫টি কলেজের ৭৫২ জন শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় দেশ-বিদেশের বরেণ্য লেখকদের বই।

আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম’-এর আওতায় গত বছর ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেয়েছে বই পড়ার। সেই বই পড়ার পুরস্কার তারা পেয়েছে গতকাল।

চিত্রশালা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, দেয়ালজুড়ে ঝুলছে নানা রঙের পোস্টার, ফেস্টুন। তাতে লেখা ‘আলোকিত মানুষ চাই’, ‘বই মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু’, ‘বই পড়ুন, চিত্তকে দীপান্বিত করুন’, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। তারুণ্যকে আলোকিত করতে, তাদের স্বপ্ন দেখাতে পারে বই। বইয়ের শক্তি অপরিমেয়। আর সেই বই পড়েই বই পুরস্কার পেল তরুণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল অতিথিরা যখন পুরস্কার তুলে দিচ্ছিলেন, তখন আলোকিত তারুণ্যের মুখে লেগে ছিল বিজয়ীর হাসি, আর সেই হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল অভিভাবকদের মুখগুলোও।

পুরস্কার হিসেবে বই পেয়ে অত্যন্ত খুশি নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী চঞ্চল ইসলাম। সে পেয়েছে ‘সেরা পাঠক পুরস্কার’। নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে চঞ্চলের অভিব্যক্তি, ‘অল্প সময়ের মধ্যেই পড়েছি ১২টি বই। প্রতিটি বই ছিল রোমাঞ্চকর। সেই বইগুলো আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে, পাশাপাশি জীবন সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে। ’

বই পুরস্কার পেয়ে আপ্লুত হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া মেহজাবীনও। নিজের বই পড়া প্রসঙ্গে সে বলল, ‘স্কুলে থাকতে বই পড়তাম খুব। কলেজে ওঠার পর বই পড়ার আগ্রহ এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ বেড়েছে। আমার আগ্রহ মেটাতে বইগুলো খুব হেল্প করেছে। ’

এবার একাদশ শ্রেণির বইপড়া কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বাংলা সাহিত্য ও পৃথিবীর কিশোর সাহিত্যের সেরা ১২টি বই পড়ার সুযোগ পায়। বইগুলো পড়ার পর তাদের জন্য ছিল একটা ছোট্ট পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বইপাঠ মূল্যায়ন করা হয়। তারপর পঠিত বইয়ের ওপর ভিত্তি করে চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। তাতে ছয়টি বই পড়ার জন্য শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ‘স্বাগত পুরস্কার’, যারা আটটি বই পড়েছে তাদের জন্য ‘শুভেচ্ছা পুরস্কার’ এবং ১০টি বই পড়ার জন্য পেয়েছে ‘অভিনন্দন পুরস্কার’। আর যারা ১২টি বই পড়ছে তারা পেয়েছে ‘সেরা পাঠক পুরস্কার’।

বর্ণিল এই আয়োজনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে গতকাল উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আইএফআইসি ব্যাংকের ডিএমডি ও হেড অব বিজনেস শাহ মুহাম্মদ মঈনউদ্দিন, হেড অব ব্র্যান্ডিং আসাদুজ্জামান, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষার ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পরিচালক শরিফ মো. মাসুদ। বইপড়া কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশে ৩০০ কলেজে এই বইপড়া কর্মসূচি চালু রয়েছে। চলতি বছর থেকে আরো ২০০টি কলেজে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে হাজারো তরুণ-তরুণী পাচ্ছে দেশ-বিদেশের সেরা বই পড়ার সুযোগ। ’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘তোমাদের যেকোনো একটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠ হতে হবে। যেটা ভালো লাগে সেটার চর্চা করবে। তোমাদের যদি বই পড়তে ভালো লাগে, তবে বই পড়বে। যদি খেলাধুলা করতে ভালো লাগে তবে ধেলাধুলা করবে। গান গাইতে ভালো লাগলে গান গাইবে। তাহলে দেখবে তোমাদের ভেতর থেকেও শ্রেষ্ঠত্ব বেরিয়ে এসেছে। ’

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘জীবন সুন্দর ও আনন্দের। জীবনকে সুন্দর কিছুর সঙ্গে, ভালো কিছুর সঙ্গে যুক্ত রাখতে হয়। বই তেমনই এক উত্কৃষ্ট মাধ্যম। বইয়ের মধ্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের আত্মা জ্বলছে। সৃজনশীলতার আগুন জ্বলছে। যারা বই পড়ে তারা সেই আগুনে যেমন আলোকিত হবে, তেমনই হবে প্রকৃত মানুষ। ’

এই আয়োজনে নটর ডেম কলেজ, হলিক্রস কলেজ, ভিকারুননিসা নূন কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন নেসা মুজিব সরকারি কলেজ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিসিআইসি কলেজ, গোলাম মোস্তফা মডেল কলেজ, মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট, শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি মহাবিদ্যালয়, ঢাকা কমার্স কলেজ, শহীদ জিয়া গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বই পুরস্কার পায়।


মন্তব্য