kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন প্রেসিডেন্ট মিশেল তেমার

অভিশংসিত দিউমার জন্য ব্রাজিলজুড়ে বিক্ষোভ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অভিশংসিত দিউমার জন্য ব্রাজিলজুড়ে বিক্ষোভ

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিউমা হুসেফের অভিশংসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় নেমে পড়ে তাঁর সমর্থকরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষও বাধে। বুধবার রাতে সাও পাওলো থেকে তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

ব্রাজিলে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে দিউমা হুসেফকে অভিশংসনের ঘটনায় রাজধানী ব্রাসিলিয়াসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলছে। পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

অভিশংসনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কয়েকটি আঞ্চলিক মিত্র দেশ। ইতিমধ্যে ভেনিজুয়েলা ব্রাজিল থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছে। একই ঘোষণা দিয়েছে আরো দুই দেশ। তবে ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ বলেছে, তারা ব্রাজিলের সিনেটের সিদ্ধান্তের প্রতি ‘শ্রদ্ধাশীল’।

গত বুধবার ব্রাজিলের আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেট দিউমা হুসেফকে অপসারণ করে। সিনেটের ভোটাভুটিতে ৬১-২০ ভোটে ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট দিউমা হুসেফের বিদায় নিশ্চিত এবং ১৩ বছরের বামপন্থী শাসনের অবসান হয়। অভিশংসনের কয়েক ঘণ্টা পরই দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন রক্ষণশীল নেতা মিশেল তেমার। অভিশংসনের ঘটনাটি ‘পার্লামেন্টারি অভ্যুত্থান’ আখ্যায়িত করে দিউমা হুসেফ বলেছেন, তাঁকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করা হয়েছে।

দিউমা হুসেফকে অভিশংসনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাজপথে নামে দিউমার সমর্থকরা। রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় ন্যাশনাল কংগ্রেস ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। এ সময় বিক্ষোভকারীদের একজন ৬১ বছর বয়স্ক প্রবীণ কৃষক অরলেন্দো রিবেইরো বলেন, ‘আমরা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করছি। ’

ব্রাসিলিয়া ছাড়াও রিও ডি জেনেইরো, সাও পাওলো, সান্তা কাতারিনা, রিও গ্রান্দে দো নর্তে, মিনাস গেরাইস, রিও গ্রান্দে দো সুল, সিয়েরা, পারানা ও পারায় গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করে দিউমাপন্থীরা। সাও পাওলোতে গত তিন দিন ধরেই বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভের তীব্রতা সেখানেই সবচেয়ে বেশি। গতকাল ওই শহরে ব্রাজিল পপুলার ফ্রন্ট ও পিপল ফিয়ারলেস ফ্রন্ট কয়েক হাজার সমর্থক নিয়ে রাস্তায় নামে। সেখানে একটি স্থানে দিউমাপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ব্রাজিলের এ বৃহত্তম শহরে গতকাল রাস্তায় নামে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন মিশেল তেমেরের সমর্থকরাও।

সোশ্যালিজম অ্যান্ড ফ্রিডম পার্টির প্রেসিডেন্ট লুইজ আরাওজো মনে করেন, দিউমার অভিশংসন ব্রাজিলের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের প্রতি একটা ধাক্কা। এতে অসম্ভবকে সম্ভব করার যে আশা বামপন্থী সরকার দেখিয়েছিল তা নিভে গেল। দেশের অভিজাত শ্রেণি এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ১৯৮৮ সালের সংবিধানের মাধ্যমে অর্জিত নাগরিক অধিকার বিলোপ করে দেবে।

বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলো। ভেনিজুয়েলা গত বুধবারই ব্রাজিল থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। জবাবে ব্রাজিলও একই কাজ করে। এ ছাড়া ভেনিজুয়েলার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী আলবা জোট দিউমার বিরুদ্ধে ‘পার্লামেন্টারি অভ্যুত্থানের’ নিন্দা জানায়। কিউবা ও নিকারাগুয়া এ জোটের অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি ইকুয়েডর ও বলিভিয়া সরকার ব্রাসিলিয়া থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেবে। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ বিশেষ করে আর্জেন্টিনা, চিলি ও প্যারাগুয়ে জানায়, তারা ব্রাজিলের সিনেটের সিদ্ধান্তের প্রতি ‘শ্রদ্ধাশীল’।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ ব্রাজিলের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জন কিরবি বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা খবরে দেখেছি যে ব্রাজিলীয় সিনেট ব্রাজিলের সাংবিধানিক কাঠামো অনুসরণ করে প্রেসিডেন্ট হুসেফকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে যে দৃঢ় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে, নিশ্চিতভাবেই সেটা আমরা অব্যাহত রাখব। ’

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ব্রাজিলের নতুন প্রেসিডেন্ট তেমেরকে স্বাগত জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, প্রেসিডেন্ট তেমেরের নেতৃত্বকালে ব্রাজিল ও জাতিসংঘ তাদের ঘনিষ্ঠ অংশীদারি বজায় রাখবে। ’ সূত্র : স্পুটনিক নিউজ, রয়টার্স।

অপসারিত দিউমা, নতুন প্রেসিডেন্ট তেমার : প্রেসিডেন্ট পদ থেকে দিউমা হুসেফ অপসারণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ব্রাজিলিয়ান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট পার্টির নেতা ৭৫ বছর বয়সী মিশেল তেমার। শপথগ্রহণের পর ব্রাজিলের নতুন যুগের সূচনার অঙ্গীকার করেন তিনি। নতুন প্রেসিডেন্ট ২০১৮ সালে পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বুধবার দেশটির আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটে সিনেটের ভোটাভুটিতে দিউমা হুসেফের বিদায় নিশ্চিত হয়। এর আগে গত মে মাসে দিউমা হুসেফের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তখন তাঁকে ছয় মাসের জন্য বরখাস্ত করেছিল সিনেট। বুধবার তাঁকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করা হলো।

গত বুধবার সিনেট ভোটাভুটির পর দিউমা হুসেফ বলেন, “কোনো অপরাধ ছাড়াই তাঁরা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খর্ব করল। তাঁরা একজন নিরপরাধী ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত এবং ‘পার্লামেন্টারি অভ্যুত্থান’ সংঘটিত করল। ’’

শপথ নেওয়ার পর টেলিভিশনে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ১১ শতাংশ বেকারত্ব মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁকে সমর্থন দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। চীনে জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে যোগ দিতে দেশ ছাড়ার আগে দেওয়া এক ভাষণে রক্ষণশীল এ নেতা বলেন, ‘এই মুহূর্তটি ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার আশা জাগিয়েছে। অনিশ্চয়তা শেষ হয়েছে। ’

শপথগ্রহণের পর মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ব্রাজিল সরকারের জন্য নতুন যুগের সূচনা করার অঙ্গীকার করেন নতুন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেনশিয়াল শাসনের অংশ হিসেবে আজ আমরা দুই বছর চার মাস সময়ের জন্য নতুন একটি যুগের সূচনা করলাম। ’

দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে কয়েক বছর আগেও ব্রাজিল বিশ্বে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। কিন্তু মন্দার কবলে পড়ে ব্রাজিলের অর্থনীতি ক্রমেই খারাপের দিকে যায়। এর ওপর রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি পেট্রোব্রাসের ঘুষ কেলেঙ্কারি প্রেসিডেন্ট হুসেফের জোট সরকারের ওপর কালো ছায়া ফেলে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। তারা হুসেফের পদত্যাগ দাবি করে।

হুসেফ মাত্র আড়াই বছর আগে ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস সদস্যদের দুর্নীতি এবং বাজেট ঘাটতি কম দেখানোর অভিযোগ তাঁর সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পেট্রোব্রাস কেলেঙ্কারির সঙ্গে অবশ্য হুসেফের কোনো সংস্পর্শ পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর জোট সরকারের শরিক অনেক নেতা এবং ব্রাজিলের ব্যবসায়ী নেতাদের অনেকেই জড়িত আছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তদন্তের পর শরিক দলের অনেক নেতা ও কংগ্রেস সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর একসময় প্রেসিডেন্ট হুসেফের বিরুদ্ধে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে দেখানোর অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, ২০১৮-এর নির্বাচনে সুবিধা পেতেই এমনটি করেছেন তিনি। এ অভিযোগেই অভিশংসনের কবলে পড়েন তিনি।

তবে হুসেফ বরাবরই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সিনেট শুনানিতে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো ন্যায্যতা নেই। হুসেফ দাবি করেন, তিনি আইন ভঙ্গ করেননি। এমন কোনো কাজ করেননি যার জন্য তাঁকে অভিশংসন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার সরকার ভুল করেছে কিন্তু কখনো ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করেনি। যে অপরাধ আমি করিনি, সে অভিযোগ অযৌক্তিক ও অন্যায়ভাবে আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। ’

সূত্র : স্পুটনিক নিউজ, রয়টার্স,  এএফপি, আল-জাজিরা।


মন্তব্য