kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্মৃতিময় একাত্তর

‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

ফখরে আলম, যশোর   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

একাত্তরের সেপ্টেম্বরে যশোর রোডে শরণার্থীর মিছিল। ছবি : সংগৃহীত

‘সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, ঘর ভেঙ্গে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে,/যশোর রোডের দু’ধারে মানুষ এত এত লোক শুধু কেন মরে?/শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শিশু মরে গেল,/যশোর রোডের যুদ্ধক্ষেত্রে ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো/কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,/আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে?/ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ,/মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালো রাত কবে হবে শেষ। ’

বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর এই চরণগুলো আজও চোখে জল আনে।

পাঠ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভীষিকাময় নানা স্মৃতি। ঐতিহাসিক যশোর রোডের লাখ লাখ শরণার্থীর মানবেতর জীবনযাপন, ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, ধর্ষিত মায়ের আহাজারি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অনবদ্য দলিল অ্যালেন গিন্সবার্গের এই সাড়া জাগানো কবিতা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে কবি এসেছিলেন যশোর রোডে। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিজ চোখে দেখার। তিনি দেখেছিলেন বেনাপোলের ওপারে ভারতের পেট্রাপোল থেকে কলকাতা পর্যন্ত যশোর রোডে শরণার্থীর ঢল। বাস্তুহারা এসব অসহায় শরণার্থীর অশ্রুকান্নায় নিজেকে সমর্পণ করে কবি কলম ধরেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য।

সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে নিউ ইয়র্কে টানা তিন দিন বসে অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন ঐতিহাসিক সেই কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। পরবর্তী সময়ে কবিতাটি তিনি বিভিন্ন স্থানে পাঠ করেন। বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সবার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেন। মুক্তিযুদ্ধকে শাণিত করার জন্য কবিতার মাধ্যমে গড়ে তোলেন বিশ্ব জনমত।

বিখ্যাত এই কবিতা নিয়ে গান করেছেন পৃথিবীর খ্যাতিমান শিল্পীরা। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গান গেয়েছেন বব ডিলান। এই শিল্পী কবিতা পড়ে কেঁদেছেন, গান গেয়েও কেঁদেছেন। স্বাধীনতার পর কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেন খান মোহাম্মদ ফারাবী। তাঁর অনবদ্য অনুবাদ মানুষকে ভাবায়। মানুষকে কাঁদায়।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে এসে আজও সেপ্টেম্বর মাস এলে কেউ কেউ যুদ্ধদিনের স্মৃতি হাতড়ান। ফিরে যান একাত্তরে। যশোর রোড ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।

৩০ লাখ শহীদের রক্ত, অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জত, সন্তানহারা মায়ের কান্না আর ইন্দিরা গান্ধী ও অ্যালেন গিন্সবার্গদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অবশেষে জন্ম নেয় নতুন দেশ—বাংলাদেশ। সেই দেশটির কেউ না কেউ আজও সেপ্টেম্বরে আবেগতাড়িত হয়ে উচ্চারণ করেন—‘সময় চলেছে রাজপথ ধরে যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল,/সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, গরুগাড়ী কাদা রাস্তা পিছিল/লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে, লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়,/ঘরহীন ভাসে শত শত লোক লক্ষ জননী পাগলপ্রায়। ’


মন্তব্য