kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অবস্থান শনাক্ত তামিমের সহযোগীদের

মারজান ঢাকায়, দুজন ভারতে

ওমর ফারুক ও এস এম আজাদ   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অবস্থান শনাক্ত তামিমের সহযোগীদের

জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন ধারার নেতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীর এক ডজন সহযোগীকে খুঁজছে পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহের কাছে হামলার আগে ও পরে এদের নাম পেয়েছে তদন্তকারীরা।

এদের মধ্যে গুলশানে জঙ্গি হামলার সন্দেহভাজন পরিকল্পনাকারী জেএমবি নেতা নুরুল ইসলাম মারজানের অবস্থান চিহ্নিত করতে পেরেছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা। সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁর নাম পাওয়ার পর থেকেই তাঁর অবস্থান জানার জন্য তৎপরতা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করতে সক্ষম হয় পুলিশ ও গোয়েন্দারা। পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সূত্রে জানা যায়, গুলশানে হামলার পর সমন্বিত তদন্তে নব্য জেএমবির নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তামিমের নেতৃত্বে সংগঠিত জেএমবির একটি অংশ দেশে হামলা চালিয়ে আইএসের নামে তা প্রচার করতে চেয়েছে। গুলশানে হামলার পর কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে তামিমের তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিহত হয়। তাদের মধ্যে একজন তাওসিফ বলে নিশ্চিত করেছেন তদন্তকারীরা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তামিমের সহযোগীদের মধ্যে শরিফুল ও রিপন ভারতে আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ভারতের বর্ধমান রেলস্টেশন থেকে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি মসিউদ্দীন ওরফে মুসাকে জিজ্ঞাসাবাদে জিহাদী জন ওরফে আবু সুলেমান ওরফে সোলেয়মান নামে এক বাংলাদেশি জঙ্গির নাম উঠে আসে। পরে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই জিহাদী জনই শরিফুল। সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলার পলাতক আসামি। গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পরও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের একটি দল ভারত সফর করে শরিফুলের ছবি মিলিয়ে দেখেছে। অন্য জঙ্গি রিপন জেএমবির দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েক নেতার আত্মীয় বলেও তথ্য মিলেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জঙ্গি হামলাগুলোর সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নূরুল ইসলাম মারজান। এ ছাড়াও তামিমের সহযোগীদের মধ্যে আছেন জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা ওয়াসিম আজওয়াদ আব্দুল্লাহ ওরফে আসিফ আজওয়াদ, খেলাফত নেতা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালী, রাজীব গান্ধী ওরফে রাজীব, উত্তরাঞ্চলের মামুনুর রশিদ রিপন, শরিফুল ইসলাম খালিদ, ঢাকার জাহাঙ্গীর ওরফে মুরাদ, মানিক, ইব্রাহিম হাসান খান ও তাঁর ভাই জুনায়েন খান এবং ‘চকোলেট’ ছদ্মনামের একজন। এরা সবাই নব্য জেএমবির নামে দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তারা ‘দাওলাতুল ইসলাম’ শব্দ যুগল দিয়ে কথিত আইএসের নামও ব্যবহার করে। গত তিন বছরে তামিমের সমন্বয়ে সংগঠিত হওয়া নব্য জেএমবির প্রধান হিসেবে কাজ করছেন মাওলানা আবুল কাশেম। ‘বড় হুজুর’ নামেই তাঁকে চেনে সবাই।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশানে হামলার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআই ও কানাডা পুলিশের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। ওই হামলার পর কমান্ডো অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গির ভিসেরা পরীক্ষা করে এফবিআই নিশ্চিত করেছে তারা ক্যাপ্টাগন জাতীয় নেশাদ্রব্য সেবন করেনি। কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জে নিহত জঙ্গিদেরও একই রকমের পরীক্ষা করা হচ্ছে। তামিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাচাই করার জন্য ডিএনএ নমুনা পাঠানো হচ্ছে কানাডার পুলিশের কাছে।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান, অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া মুসা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, বাংলাদেশের জঙ্গিরাই তাকে সংগঠিত করেছে। যৌথ তদন্তে সেখানে কয়েকজন জঙ্গির ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে কাজ চলছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রায় নির্মূল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের উত্থান হওয়ার পর বিশ্বে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঘটে। ২০১৫ থেকে বাংলাদেশেও গুটিকয়েক জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি আরো বলেন, ‘গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল না। আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে হামলা হবে, কিন্তু কোথায় হবে এ ধরনের কোনো তথ্য ছিল না। ’

নব্য জেএমবির অবির্ভাবের ব্যাপারে মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা জঙ্গি সংগঠন জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমানসহ ছয় জঙ্গির ফাঁসি কার্যকরের পর মাওলানা সাইদুল রহমানের নেতৃত্বে জেএমবি পুনর্গঠন হয়। এর একটি অংশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে আলাদাভাবে তৎপরতা শুরু করে। তারাই ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ ভ্যানে হামলা করে ফাঁসির আসামি জেএমবি নেতাদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ২০১২ সালে জেএমবি আবার সক্রিয় হতে শুরু করে। উত্তরবঙ্গে একটি ক্যাম্প তৈরি করে নিউ জেএমবির সৃষ্টি হয়। তিনি আরো বলেন, জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত দুই গোষ্ঠী নিউ জেএমবি ও এবিটি পরস্পরের সহযোগী। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এবিটি অর্থসংকটে পড়লে নিউ জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা তামিম চৌধুরী তাঁদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

মনিরুল জানান, নিউ জেএমবির প্রধান তামিম চৌধুরী ২০১৩ সালের দিকে কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসেন। এই তামিম চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে এখানে আইএস বলে কিছু নেই। জেএমবির মতাদর্শীরাই তাঁর সহযোগী। তামিম নিহত হওয়ার আগে ও পরে তাঁর কয়েকজন সহযোগীর ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গুলশানে হামলার ছবি তুলে মারজানের আইডিতে পাঠায় হামলাকারী জঙ্গিরা। পরে মারজান ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে। হলি আর্টিজানে হামলার রাতে জঙ্গিরা ‘উইকার অ্যাপ’ নামের একটি বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে বাইরে যোগাযোগ করে এবং ছবি পাঠায়। এই মারজান জেএমবির অপারেশনাল কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও অর্থ সংগ্রহকারী বলে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পলাতক জঙ্গি নেতা তামিম, মেজর জিয়া ও মারজানকে খোঁজা হচ্ছিল। এর মধ্যেই পুলিশের অভিযানে তামিম নিহত হয়েছেন। এখন মারজান ও মেজর (বরখাস্ত) জিয়াউল হককে খুঁজে বের করতে তৎপর তারা।

ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, গুলশানে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম মারজান। দুজনই নব্য জেএমবির অন্যতম অপারেশনাল কমান্ডার। জিয়াউল হক আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সামরিক কমান্ডার হিসেবে কাজ করছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে তামিমের সঙ্গে নিহত দুই জঙ্গির মধ্যে ফজলে রাব্বির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলেও আরেকজনের পরিচয় নিয়ে কয়েক দিন সংশয়ে ছিল পুলিশ। তবে মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত যুবক ধানমণ্ডি থেকে নিখোঁজ হওয়া তাওসিফ। শুরু থেকে ছবি ও অন্যান্য তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া গেছে, নিহত যুবক তাওসিফ হতে পারে। পরে আরো যাচাই করে পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

সিটিটিসি ইউনিট সূত্রে জানা যায়, নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক রিপনকে মান্য করে বেশির ভাগ নেতাকর্মী। এর একটি কারণ হলো বিভিন্ন সময়ে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া জেএমবির একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সে। তামিমের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা ছিল তার।  

সূত্রমতে, মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসা জেএমবির এই অংশটি মাওলানা কাশেমকে বড় হুজুর বলে মানছে। দেশে এসে এই বড় হুজুরের সংস্পর্শে যান তামিম। জেএমবির খেলাফত প্রতিষ্ঠার নেতা আবু ইউসুফ বাঙালির সঙ্গেও তামিমের ঘনিষ্ঠতা হয়। এই জেএমবি নেতাই ‘দাওলাতুল ইসলাম’ নামটি প্রচার করার পরামর্শ দেন। ওয়াসিম আজওয়াদ জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা। আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে। তামিমের সহযোগীদের আস্তানা পরিদর্শন করেছে সে। সম্প্রতি জেএমবির কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হিসেবে রাজীব গান্ধী ওরফে রাজীবের নামও বেরিয়ে এসেছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এটি তার ছদ্মনাম। এ ছাড়া তামিমের সহচর ছিল কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গি রায়হান কবির এবং নারায়ণগঞ্জে নিহত ফজলে রাব্বি ও তাওসিফ। এমনই আরেক সঙ্গী মানিক। তবে দুর্ধর্ষ সামরিক প্রশিক্ষক জাহাঙ্গীর ওরফে মুরাদ বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করে। কথিত জিহাদিদের আস্তানায় গিয়ে সে অস্ত্র ও বোমার প্রশিক্ষণ দিত।

একটি সূত্রে জানা যায়, তামিম নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবির সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা স্থিমিত হয়ে পড়েছে। দুবাই ও পাকিস্তান হয়ে তামিমের সিন্ডিকেটে অর্থের লেনদেন হয়েছে। এতে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন, দেশীয় জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের যোগসূত্র স্থাপনের দায়িত্ব ছিল তামিমের।

সূত্র মতে, গুলশানে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ‘চকোলেট’ নামে জেএমবির এক নেতাকে খুঁজছে পুলিশ। তাঁর বাড়ি রাজশাহীতে। কয়েক মাস আগে সিরিয়ায় নিহত জঙ্গি সাইফুল ইসলাম সুজনের বাবা ও মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হাসনাতসহ কয়েকজনকে ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকাসহ আটক করে পুলিশ। হাসনাতের ওই টাকা তামিমের কাছেই যাচ্ছিল। এই চক্রটি পারিবারিকভাবে সম্পৃক্ত ছিল বলে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে তামিমসহ তিনজন নিহত হয়। এই তামিমই সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি তৎপরতার মূল হোতা বলে দাবি করছে পুলিশ। গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা এবং ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের অদূরে পুলিশের ওপর হামলার নাটের গুরুও তিনি।


মন্তব্য