kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডিএপি কারখানায় গ্যাস দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দুই কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ডিএপি কারখানায় গ্যাস দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দুই কর্মকর্তা

চট্টগ্রামে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানায় গ্যাস দুর্ঘটনার জন্য কারখানার দুই কর্মকর্তাকে দায়ী করেছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। তাঁদের প্রত্যাহার করে বিভাগীয় শাস্তি এবং তাঁদের আনুতোষিক থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব নিরাপত্তাব্যবস্থা নষ্ট থাকলেও তা মেরামতে উদ্যোগ নেননি দায়িত্বে থাকা কারখানার উপ-প্রধান প্রকৌশলী দিলীপ কুমার বড়ূয়া ও মহাব্যবস্থাপক (টেকনিক্যাল ও  মেইনটেন্যান্স সার্ভিস) মো. নকিবুল ইসলাম। এই দুই কর্মকর্তা নিরাপত্তাব্যবস্থা মেরামতের উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে কারখানার ট্যাংক বিস্ফোরণ ঘটে অ্যামোনিয়া গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে।

গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে প্রশাসনের গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। এ সময় তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মামুনুর রশিদ উপস্থিত ছিলেন।

গত ২২ আগস্ট রাত ১০টায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত ডিএপি কারখানার গ্যাস ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়। এতে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ে বেশ কয়েকজন। ৩০ জনের বেশি লোককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ওই রাতেই জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ১০ তদন্ত কমিটি করে। এই কমিটি গত সোমবার তাদের প্রতিবেদন শিল্পমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছে। গতকাল জেলা প্রশাসনের কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ২০ আগস্ট থেকে কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল। উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকার পর কারখানার সব নিরাপত্তাব্যবস্থা নষ্ট থাকার বিষয়টি অপারেশন বিভাগ থেকে মেইনটেন্যান্স বিভাগকে জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে মেইনটেন্যান্স বিভাগ সেখানে টেকনিশিয়ান পর্যায়ের লোক পাঠায়। কিন্তু টেকনিশিয়ানরা মেরামত করতে না পেরে ফিরে আসেন।

টেকনিশিয়ানদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন কারখানার উপ-প্রধান প্রকৌশলী দিলীপ কুমার বড়ূয়া এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. নকিবুল ইসলাম। তাঁরা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি তদারকি করেননি এবং নিজেরা মেরামতের কোনো উদ্যোগও নেননি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তদারকির বিষয়টি নকিবুল ইসলাম তাঁর নিয়মিত দায়িত্ব বলে মনে করেননি। তদন্ত কমিটির কাছে তিনি বলেন, তিনি সরাসরি কারখানা ঘুরে দেখেন না, তাঁর অধীনরা করেন। প্রতিবেদনে ঘুরেফিরে এই দুই কর্মকর্তার দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ট্যাংক বিস্ফোরণ হতে পারে এমন ধারণাই ছিল না সংশ্লিষ্টদের : ডিএপি সার কারখানার ট্যাংকটি বিস্ফোরিত হতে পারে এমন কোনো ধারণাই ছিল না কারখানা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী সাইদ হাসান, দুলাল কান্তি দেবনাথ ও মো. ইকবাল হোসেনের। এই কর্মকর্তারা কারখানা পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও তাঁদের কারোরই এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছিল না। তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তাঁরা বিষয়টি স্বীকার করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্টো নিজেদের কাজে গাফিলতি এড়াতে প্লান্টের নির্মাণ দুর্বল ছিল বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুত্) কাজী মাসুদুর রহমান। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সব নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি নষ্ট রেখে ও নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে দায় এড়ানোর জন্যই ট্যাংকের নির্মাণ ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসন, বাণিজ্য, হিসাব এসব শাখাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

ট্যাংকের পাঁচটি সুরক্ষা যন্ত্র নষ্ট ছিল : অ্যামোনিয়া ট্যাংকের নিরাপত্তার জন্য থাকা ‘রেফ্রিজারেশন কম্প্রেসার সিস্টেম’, ‘প্রেসার গজ’সহ পাঁচ ধরনের সুরক্ষা যন্ত্র অকেজো থাকার কারণেই ট্যাংকটি বিস্ফোরিত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্যাংকের তাপমাত্রা কমানোর জন্য ‘কুলিং/রেফ্রিজারেশন কম্প্রেসার সিস্টেম’ তিন বছরের বেশি সময় ধরে নষ্ট ছিল। ট্যাংকে রক্ষিত গ্যাসের চাপ মাপার জন্য দুটি ‘প্রেসার গজ’ রয়েছে যা, দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট ছিল।

ট্যাংকের তাপ ও চাপ মাপার জন্য স্বয়ংক্রিয় ‘ডিসিএস সিস্টেম’ রয়েছে। এই পদ্ধতিতে দুটি ‘প্রেসার ট্রান্সমিটারের’ মাধ্যমে ট্যাংকের গ্যাসের চাপ দুটি কম্পিউটারে প্রদর্শিত হয়, যার একটি দীর্ঘদিন ধরেই নষ্ট এবং অন্যটি দুর্ঘটনার আগের দিন নষ্ট হয়ে যায়। ট্যাংকে রক্ষিত অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ বের করে দেওয়ার জন্য দুটি ‘প্রেসার ভেন্ট’ রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় এ দুটিও বন্ধ ছিল। এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ট্যাংকে একটি ‘ফ্লেয়ার সিস্টেম’ রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় এটিও অকেজো ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় ৫০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকটিতে ৩৪০ মেট্রিক টন তরল অ্যামোনিয়া ছিল। একদিকে ট্যাংকের সব নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি নষ্ট ও বন্ধ থাকা, অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত গাসের চাপ, ফলে ট্যাংকটির নিচের অংশে ‘বেজপ্লেট’ বরাবর বিস্ফোরণ ঘটে। নির্গত গ্যাসের চাপে ট্যাংকটি উড়ে গিয়ে প্রায় ২০ ফুট দূরে পড়ে এবং সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়।

তদন্ত কমিটির পাঁচ সুপারিশ : ডিএপি সার কারখানাটিকে একটি জবাবদিহিতাহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে পাঁচটি সুপারিশ করেছে। এসব সুপারিশ হলো—প্রতিষ্ঠানের সব কাজকর্মে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত, ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও আন্তবিভাগীয় সমন্বয় সাধন, কার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয়, মেরামত ও অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যবস্থাপকের ওপর ন্যস্ত করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে শক্তিশালী ‘চেইন অব কমান্ড’ প্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।


মন্তব্য