kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লবণের কেজি ৪২ টাকা!

৬ সেপ্টেম্বর বৈঠক ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

আবুল কাশেম   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



লবণের কেজি ৪২ টাকা!

ভালো মানের প্যাকেটজাত খাবার লবণের কেজি ৪২ টাকায় পৌঁছেছে। ক্রুড লবণের সংকট ও দাম বাড়ার কথা বলে লবণকল মালিকরা প্রতি সপ্তাহেই লবণের দাম বাড়িয়ে নোটিশ দিচ্ছেন সরকারকে।

এ প্রবণতা থামাতে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নিলেও কোন মালিককে কত টন আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে, তা এখনো বণ্টন করেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি এখনো। এরই মধ্যে গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে লবণের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সদস্যরা। সেখানে দ্রুত লবণ আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে এসিআই কম্পানির প্রতি কেজি ‘এসিআই পিউর’ লবণের প্যাকেটের দর ছিল ৪০ টাকা। গত সোমবার কম্পানিটির বিজনেস ডিরেক্টর মো. কামরুল হাসান বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনকে এক চিঠিতে বলেছেন, দেশে ক্রুড লবণের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দামও অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় আগের খুচরা মূল্যে এখন আর লবণ বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। তাই তাঁরা লবণের কেজি ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা করতে বাধ্য হয়েছেন। সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজও তাদের লবণের কেজি ৪২ টাকা নির্ধারণ করে তা জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশনকে।

গত মঙ্গলবার কনফিডেন্স সল্টের তরফ থেকে ট্যারিফ কমিশনকে বলা হয়েছে, তারা ৪০ টাকা কেজি দরে লবণ বিক্রি করবে। এত দিন কনফিডেন্সের প্রতি কেজি লবণের দাম ছিল ৩৮ টাকা। কনফিডেন্সের তরফ থেকেও দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ক্রুড লবণের সংকট ও দাম বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে দাম বাড়াতে পূবালী সল্ট সবার চেয়ে এগিয়ে। দুই সপ্তাহ আগে বিভিন্ন কারখানা যখন লবণের কেজি ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা নির্ধারণ করছিল, তখনই পূবালী সল্ট তাদের ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেট পদ্ধতিতে পরিশোধন করা লবণের দাম এক লাফে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা করার প্রস্তাব করেছে ট্যারিফ কমিশনে।

গত ২১ জুন মোল্লা সল্ট (ট্রিপল রিফাইন্ড) ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) মো. আব্দুল মান্নান ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনের তুলনায় অপরিশোধিত লবণ কম উৎপাদন হওয়ায় কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং ইহার মূল্য মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যাহার ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা ৭৫ কেজি হিসেবে মাঠপর্যায়ে প্রতি বস্তা অপরিশোধিত লবণের দাম ১,২৫০ টাকা এবং কারখানা পর্যন্ত পরিবহন ব্যয় ও লেবার (শ্রমিক) খরচ আরো ১৫০ টাকা। এমতাবস্থায় আমাদের উৎপাদিত ভোজ্য লবণের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বছর ১৬ লাখ ৫৫ হাজার টন পরিশোধিত লবণের চাহিদা নির্ধারণ করেছে। এই পরিমাণ পরিশোধিত লবণ পেতে হলে ১৮ থেকে ১৯ লাখ টন ক্রুড লবণের দরকার হবে। বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহমুদ খানম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, বর্তমান লবণ মৌসুমে ১৫ লাখ ৫৫ হাজার টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। সে হিসাবে প্রায় তিন লাখ টন ক্রুড লবণের ঘাটতি রয়েছে দেশে। এর মধ্যে আসন্ন কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রায় সোয়া লাখ টন লবণের দরকার হবে। এই ঘাটতি মেটাতে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই আমদানির ঘোষণায় লবণের দাম না কমে উল্টো বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগামী ৬ সেপ্টেম্বর বৈঠক ডেকেছে। সেখানে লবণের পাশাপাশি অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঈদের আগেই ভারত থেকে লবণ আমদানি শুরু হবে। এর পরে প্রয়োজন হলে আরো লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।

মিল মালিকরা গুদামে ক্রুড লবণ মজুদ করে বাইরে সংকট দেখিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন কি না, তা যাচাই করতে ট্যারিফ কমিশনের দুজন কর্মকর্তা গত দুই সপ্তাহ দেশের সব কটি চিনিকল পরিদর্শনে যান। তবে লবণকলগুলোর গুদামে ক্রুড লবণের অস্বাভাবিক মজুদ পাননি তাঁরা। ১৮ হাজার টন ক্রুড লবণ মজুদের গুদাম রয়েছে এসিআইয়ের। সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে এক থেকে দেড় হাজার টন ক্রুড লবণ পেয়েছেন ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা। প্রায় একই অবস্থা অন্য কারখানাগুলোতেও।

চট্টগ্রাম ও খুলনার লবণকলগুলো পরিদর্শনে গিয়ে ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা দেখেছেন, খুলনার বিভিন্ন বাজারে ভারতীয় পরিশোধিত লবণের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে বেশ কম দামে। আবার চট্টগ্রাম এলাকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মিয়ানমার থেকে ক্রুড লবণ অবৈধভাবে এনে বিক্রি করছেন। দেশে ক্রুড ও পরিশোধিত লবণের দাম অনেক বেশি হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ দুটি থেকে অবৈধ পথে লবণ ঢুকছে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণের একটি পদ্ধতি রয়েছে ট্যারিফ কমিশনের। কাঁচামালের মূল্যের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে নির্ধারিত ব্যয়, কারখানা মালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা যোগ করে মূল্য নির্ধারণ করে তারা। ৭৫ কেজি ক্রুড লবণের বর্তমান বাজারদর এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা। পরিশোধন ব্যয় ও অন্য সব খরচ এবং বিভিন্ন স্তরে মুনাফা যোগ করলে ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেট পদ্ধতিতে শোধন করা প্রতি কেজি লবণের দাম ৪০ টাকা যৌক্তিক বলে মনে করে ট্যারিফ কমিশন। লবণের দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে দুই লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে ট্যারিফ কমিশন। গত ১৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৭৫ হাজার টন পরিশোধিত ও ৭৫ হাজার টন অপরিশোধিত লবণ আমদানি উন্মুক্ত করে আদেশ জারি করে। তবে ভারতে প্রতি কেজি ক্রুড লবণের দাম এখন ৮০ পয়সা। তাই লবণকল মালিকরা আমদানিতে উৎসাহী। এ অবস্থায় কোন লবণ কলকে কী পরিমাণ লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে, তা এখনো বণ্টন করেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে আমদানিও শুরু হয়নি। এই দেড় লাখ টন লবণ আমদানি হলে বাজারে দাম কমবে বলে আশা করছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে লবণের নতুন মৌসুম শুরু হবে।  

লবণকল মালিক সমিতির সভাপতি ও পূবালী সল্টের মালিক পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, বর্তমানে লবণ আমদানির ওপর ৯৩ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। সরকার এই শুল্কহার দ্বিগুণ করে হলেও লবণ আমদানি অবাধ করে দিলে দেশের মানুষ ১০ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে লবণ খেতে পারবে। না হলে লবণের দাম কমবে না।


মন্তব্য