kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

বিরল দৃষ্টান্ত

নওশাদ জামিল   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিরল দৃষ্টান্ত

সদ্য প্রয়াত কবি শহীদ কাদরী ছিলেন যেন ‘চির বাউণ্ডুলে’। কলকাতায় জন্ম, তবে ঢাকা ছিল তাঁর প্রিয় শহর।

দেশভাগের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা নিয়ে ১০ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে চলে আসেন ঢাকায়। কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলো কেটেছে ঢাকার অলিগলিতে।

কলকাতা নয়, বাংলাদেশই ছিল তাঁর ‘প্রিয়তমা’ স্বদেশ, যাকে উদ্দেশ করেই তিনি লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’। একপর্যায়ে যৌবনের দিনগুলো পেছনে ফেলে ১৯৭৭ সালে পাড়ি জমান বিদেশে। লন্ডন, বার্লিন, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ঘুরে থিতু হয়েছিলেন নিউ ইয়র্কে। জীবনের শেষ ত্রিশটি বছর তিনি এখানেই কাটিয়ে দিয়েছেন। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রহণ করেননি ওই দেশের পাসপোর্ট, নেননি নাগরিকত্ব।

স্বদেশ থেকে দূরে থাকলেও হৃদয়ের গহিনে কবি সব সময় লালন করতেন বাংলাদেশের অস্তিত্ব। বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টই ছিল তাঁর সত্যিকার পরিচয়। গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে কবির স্ত্রী নীরা কাদরীর সঙ্গে আলাপ হলো। জানালেন, গত বছরই তিনি (শহীদ কাদরী) বাংলাদেশের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) নবায়ন করেছিলেন। বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরির জন্য যোগাযোগ করেছিলেন নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সঙ্গে। পরে গত বছরের ১৩ আগস্ট বিশেষ ব্যবস্থায় ডিজিটাল পাসপোর্ট ইউনিট নিয়ে শহীদ কাদরীর বাসভবনে হাজির হয় কনস্যুলেটের এমআরপি বিভাগের টিম। সেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েই প্রিয় স্বদেশে ফিরলেন নিথর কবি।

নীরা কাদরী বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ ছিল তাঁর। সেটা গ্রহণ করলে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধাও তিনি পেতেন। এ ব্যাপারে দু-একবার তাঁকে বলেছিলামও। কিন্তু তিনি রাজি হননি। প্রতিবারই বলেছেন, ‘বাংলাদেশই আমার দেশ, যত দিন বেঁচে থাকব, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই থাকব’। ”

এ সম্পর্কে কবি শহীদ কাদরীর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। তা ছাপা হয়েছিল একটি জাতীয় দৈনিকে, ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব কেন নেননি, এ সম্পর্কে কবি বলেছিলেন, ‘আমার মর্যাদা হচ্ছে বাংলাদেশ, তাই আমি এটি গ্রহণ করতে পারি না। কারণ আমি আমার দেশ ও মাটির গন্ধ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। সিটিজেনশিপ নিলে অনেক সুযোগ-সুবিধা পেতাম। কিন্তু তা করিনি। ’

দেশে কবে ফিরবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সেই সাক্ষাৎকারে শহীদ কাদরী বলেছিলেন, ‘মন তো চাইছে এক্ষুনি চলে যাই। কিন্তু তা পারছি না। সপ্তাহের তিন দিন ডায়ালিসিস নিতে হচ্ছে। তবে আশা করছি, শিগগিরই দেশে যাব। বড় ভাইকে অনেক দিন দেখি না। মনটা কেমন যেন করছে। তিনিও আসতে পারছেন না। বিমানে উঠতে ভয় পান। একটু সুস্থ হলেই যাওয়ার চেষ্টা করব। পুরোপুরি তো আর ভালো হওয়ার সুযোগ নেই। ’

শহীদ কাদরীর জীবনের শেষ দিনগুলোর উল্লেখ করে নীরা কাদরী বলেন, ‘শেষ জীবনে তাঁর জীবনটা ছিল হুইলচেয়ারে বাঁধা। একটুক্ষণের জন্যও হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে পারতেন না। কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এক দিন পর পর ডায়ালিসিস নিতে হতো। আর ডায়ালিসিসের পর খুবই ক্লান্ত থাকতেন। ডায়ালিসিস নিতে নিতে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরত। ’

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও দেশের পটপরিবর্তন শহীদ কাদরী মানতে পারেননি। প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন মনে। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ধিক্কার জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘হন্তারকদের প্রতি’। পরে অভিমান নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান, আশ্রয় নেন অন্য দেশে। অবশ্য পরে বিভিন্নজনকে সাক্ষাৎকারে দেশ ছাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘মাতৃভূমি ছাড়তে নেই, মাতৃভূমি ত্যাগ করা লেখকের আত্মহত্যার শামিল। ’ অভিমান করে দেশ ছাড়াকে তিনি বলেছিলেন ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’। হয়তো এ জন্যই আমৃত্যু বাংলাদেশের পাসপোর্টই ছিল তাঁর পরিচয়। বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেও শেষ জীবনে তিনি দেশের মাটিতে ফিরতে চাইতেন। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে কবি বলেছিলেন, ‘আমি মৃত্যুর গন্ধ টের পাচ্ছি। আমাকে বাংলাদেশ ডাকছে। ’

অবশেষে দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর স্বদেশে ফিরেছেন কবি। কবির এই প্রত্যাবর্তনকে ‘রাসজিক প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রাবন্ধিক ও লেখক মফিদুল হক। গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সব শ্রেণির মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে কবি শেষশয্যা নিলেন প্রিয় স্বদেশের মাটিতেই।


মন্তব্য