kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শহীদ কাদরী

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় কবিকে বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় কবিকে বিদায়

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কবি শহীদ কাদরীর মরদেহে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশই ছিল তাঁর ‘প্রিয়তমা’, দেশকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’। পরে বুকচাপা অভিমান নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন।

অবশেষে প্রায় চার দশক পর প্রিয় স্বদেশের মাটিতে ফিরলেন কবি শহীদ কাদরী, তবে লাশ হয়ে। স্বদেশের মাটিতে ঠাঁই নেওয়ার অন্তিম ইচ্ছা ছিল তাঁর, সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে গতকাল বুধবার দেশে আনা হয় কবির মরদেহ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে একনজর দেখতে, শেষবিদায় জানাতে ছুটে এসেছিল ভক্ত, অনুরাগী, পাঠক, সুহৃদসহ নানা শ্রেণির মানুষ। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিকে জানানো হলো শেষ বিদায়। পরে সমাহিত করা হয় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

গত রবিবার নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে মারা যান ৭৪ বছর বয়সী শহীদ কাদরী। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত উদ্যোগে ও ব্যক্তিগত খরচে গতকাল কবির মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সকাল ৯টা ১০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে কবির মরদেহ। আরেকটি ফ্লাইটে বাংলাদেশে আসেন কবির স্ত্রী নীরা কাদরী ও ছেলে আদনান কাদরী। বিমানবন্দরে সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মো. জয়নুল আবেদিন বীরবিক্রম ও বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার. কবি আবুল হাসনাত প্রমুখ। বিমানবন্দর থেকে কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বারিধারায় তাঁর বড় ভাই শাহেদ কাদরীর বাসায়। সেখানে আত্মীয়স্বজন কবিকে শেষ বিদায় জানায়।

বারিধারার বাসা থেকে সোয়া ১১টায় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে সেখানে কবিকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানায় সর্বস্তরের মানুষ।

বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতি আমৃত্যু ছিল কবির অপরিমেয় ভালোবাসা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড তিনি মানতে পারেননি। খুনিদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে কবি লিখেছিলেন তাঁর অমর কবিতা ‘হন্তারকদের প্রতি’। শ্রদ্ধা নিবেদনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কবিকে জানানো হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে কবির কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তাঁর সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নুল আবেদিন ও বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। এরপর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে অতিরিক্ত সচিব মনজুরুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি ফুল দেন কবির কফিনে।

শহীদ মিনারের বেদির উল্টো দিকে গগনশিরীষের গাছগুলোর নিচেই কালো কাপড়ে ঢাকা অস্থায়ী মঞ্চ বানানো হয়েছিল। কবির কফিন রাখা হয় সেই শ্যামল ছায়ায়। কফিন ছুঁয়ে, শেষ দেখা শেষে অনেকেই কাঁদলেন। চোখের জলে ভাসলেন বন্ধু-স্বজনরা। শোকে বিহ্বল হলেন সুধীজন থেকে সর্বসাধারণ। প্রিয় কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে, কফিনে একটি ফুল রাখতে দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে এসেছিল অনেক মানুষ। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আর কান্নার মিশেলে ভারী হয়ে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। কফিনের কিছু অংশ ছিল খোলা, তা দিয়ে কেবল কবির মুখটুকু দেখা যাচ্ছিল। সেদিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে অনেকেই ছাড়ল দীর্ঘশ্বাস।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বাংলা একাডেমি, গণসংহতি আন্দোলন, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, ছায়ানট, ঢাকা থিয়েটার, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, খেলাঘর, জাতীয় কবিতা পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কবির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এ ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে কবির শ্রতি শ্রদ্ধা জানান রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, মফিদুল হক, শামসুজ্জামান খান, মুনতাসীর মামুন, আবুল হাসনাত, ইমদাদুল হক মিলন, হারুন হাবীব, আবুল বারক আলভী, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, দিলারা হাফিজ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, মনজুরুল আহসান বুলবুল প্রমুখ।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। বাদ জোহর সেখানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় কবিকে।

জাতীয় কবিতা পরিষদের কবি মুহাম্মদ সামাদ জানান, আগামী ৭ সেপ্টেম্বর কবি শহীদ কাদরীর স্মরণে নাগরিক শোকসভা আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও কবিতা পরিষদ। সেদিন বিকেল ৪টায় একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এ সভা হবে।

স্মৃতিতে, বিষাদে কবিকে স্মরণ : কবির স্মৃতি স্মরণ করে গতকাল শহীদ মিনারে আপ্লুত হয়ে পড়েন কবি, লেখক, সাহিত্যিকরা। কবির কবিতা ও যাপিত জীবনের ওপর মূল্যায়ন করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশের অমর কবিদের কাতারে স্থান পাবেন। এত কম কবিতা লিখে এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিরল ঘটনা। তাঁর কবিতা এখনো আধুনিক এবং নান্দনিক। ’

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, ‘কবি শহীদ কাদরী খুব বেশি লেখেননি, তবে যা লিখেছেন ভাস্করের মতো খোদাই করে লিখেছেন। কবিতায় তিনি যে জীবনদর্শন তুলে এনেছেন সেখানে বারবার বাঙালি পাঠককে ফিরে আসতে হবে। ষাটের দশকে যা লিখেছেন বর্তমান সময়েও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি কালজয়ী হয়ে উঠেছেন প্রকাশভঙ্গিতে, ভাষা ব্যবহারে, জীবনদর্শনে। তাঁর লেখা বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালি জাতির কাছে স্থায়ী সম্পদ হয়ে রইবে। ’

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘আমাদের সাহিত্যের আলোগুলো দিনে দিনে নিভে যাচ্ছে। প্রিয় মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন একে একে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বিদায় দিতে হচ্ছে তাঁদের। এর মধ্যে কবি শহীদ কাদরী তাঁর কবিতা দিয়ে মৃত্যুকে জয় করেছেন। তাই তিনি না থেকেও আমাদের মাঝে রয়েছেন—কবিতার আশ্রয়ে। ’

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ‘তুমুল আড্ডাবাজ ছিলেন কবি। সেই আড্ডা কবিতার আড্ডা, সৃষ্টিশীলতার আড্ডা। সেই আড্ডায় দেশ-বিদেশের কবিতার প্রবণতা নিয়ে কথা বলতেন। প্রাণখুলে হাসতেন, হাসাতেও পারতেন তিনি। তাঁর কবিতা বাংলা ভাষার অমূল্য সম্পদ। ’

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে তিনি অন্যতম প্রধান কবি। আমাদের সান্ত্বনা, তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছি। তাঁর কবিতায় ব্যক্তি চেতনা মূর্ত হয়ে ওঠে। তিনি কবিতায় মানবিক সম্পর্কেও কথা বলেছেন। তিনি বাংলাদেশের পাঠকের হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। ’

কবির সহধর্মিণী নীরা কাদরী বলেন, ‘আমি শুধু স্বামীকে নয়, প্রিয় মানুষটিকেও হারিয়েছি। তাঁর মুখের কথাও ছিল কবিতার মতো। ’

কবির ছেলে আদনান কাদরী বলেন, ‘বাবা দেশে ফিরতে চাইতেন। নানা কারণে আসতে পারেননি। শেষ জীবনে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। তিনি নতুন করে লিখতে শুরু করেছিলেন। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি কথা বলেছিলেন, তাঁর চিন্তাশক্তি ছিল। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনায় প্রধানমন্ত্রী ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানাই। ’

১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতায় জন্ম নেওয়া শহীদ কাদরী সাতচল্লিশে দেশভাগের পর বাংলাদেশে আসেন। ১৯৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে তিনি; জার্মানি, ইংল্যান্ড হয়ে ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন শহীদ কাদরী। পাঁচ বছর ধরে হুইলচেয়ারে ছিল তাঁর চলাফেরা। গত ১৪ আগস্ট তিনি ৭৪ বছরে পা দেন। গত ২১ আগস্ট রাতে নিউ ইয়র্কের নর্থ শোর হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখান থেকেই কবি পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে।

‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ ও ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দিও’—মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে বাংলা কবিতায় অমর হয়ে আছেন কবি।

 


মন্তব্য