kalerkantho


বস্তির নাটক

অভিনয়ে নিজের জীবন

জামাল হোসেইন   

৫ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০



অভিনয়ে নিজের জীবন

রাজধানীর ভাসানটেক বস্তিতে সখী চেঞ্জমেকার থিয়েটার গ্রুপের নাটকে অভিনয় করছেন বস্তিবাসী তরুণ-তরুণীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘খুব খারাপ ছেলে ছিলাম আমি। পথের পাশে বা স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতাম।

এটা করে এক ধরনের মজা পেতাম। এর মধ্যে জানতে পারলাম, বস্তির বটতলায় প্রতি সপ্তাহে নাটক হয়। সেখানে বস্তির মেয়েরা নাটক দেখতে যায়। আমিও গেলাম। আর দেখলাম, আমার বন্ধু সজিবও অভিনয় করছে। এরপর প্রায়ই সজিবের নাটক দেখতে যেতাম। একদিন একজন অভিনেতা আসেননি, যিনি বড় ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করতেন; নাটকে যাঁর বোনকে ছেলেরা পথেঘাটে উত্ত্যক্ত করে। বন্ধুর অনুরোধে আমি বড় ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করি। অভিনয় শেষে খুব লজ্জিত হয়েছি। আর অতীত আচরণ মনে করে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়েছে। ’ নাটকের মাধ্যমে তাঁর মতো বস্তির অনেকেরই আচরণে পরিবর্তন এসেছে বলে জানালেন রাজধানীর ভাসানটেক বস্তির তরুণ আল-আমিন হোসেন বিটু।

পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার বেঁটেখাটো বিটু ছিল মেয়েদের চোখে সবচেয়ে খারাপ ছেলে। খুব সকালে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার জন্য ঘর থেকে

বের হতো সে। ফিরত রাতে। চাঁদপুরের এই ছেলেটিকে তার পরিবার কোনোভাবেই সামলাতে পারত না। অথচ নাটকে বড় ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তার আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বস্তিতে বিটু এখন ‘বড় ভাই’ নামে পরিচিত। বস্তির মেয়েদের এখন বিটুর সামনে কেউ উত্ত্যক্ত করার সাহস করে না।

ভাসানটেক ও বাউনিয়াবাঁধ বস্তির কিশোর-কিশোরী এবং তরুণ-তরুণীরা মিলে গড়ে তুলেছে নাট্যদল ‘সখী চেঞ্জমেকার থিয়েটার গ্রুপ’। বেসরকারি সংস্থা ‘আমরাই পারি’-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এই নাট্যদল। বাল্যবিবাহের কুফল, যৌতুক, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্য সহায়তা, শিক্ষার সুফল, মাদকের কুফলসহ বস্তির বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করে নাটকের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়। জীবনের সঙ্গে মিলে যাওয়া এসব নাটক দেখতে ভিড় করে অনেকেই।

জানা গেছে, নাট্যদল গড়ার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অভিনেতা-অভিনেত্রী সংগ্রহ করা। ছেলেরা এগিয়ে এলেও মেয়েদের কোনোভাবেই আকৃষ্ট করা যাচ্ছিল না। এ ক্ষেত্রে অভিনয়ের জন্য রাজি হওয়া মেয়েদের সার্বিক দায়দায়িত্ব নিতে হয়েছে নাট্যদলের কর্মকর্তাদের। তাদেরই একজন শারমিন আক্তার। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই ছাত্রী বলল, ‘বাবা কোনোভাবেই চাইতেন না আমি বস্তির নাটকে অভিনয় করি। এতে আমার নাকি বিয়ে হওয়া নিয়ে সমস্যা হবে। তবে মা খুব করে চাইতেন। নিজের জীবনের ইচ্ছেগুলোই যেন মা আমাকে দিয়ে পূরণ করতে চাইতেন। শেষ পর্যন্ত মা-ই বাবাকে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন। বাবা এখন আমার নাটকের একজন ভালো দর্শক। ’

শারমিনের মতোই বাবার বাধানিষেধ আর বাউনিয়াবাঁধ বস্তির পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে নাটকে করছেন দুই বোন সাহেরা ও রোজিনা। সাহেরা আক্তার পড়েন মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্বে। আর রোজিনা আক্তার একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে বেড়ে ওঠা কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের এই দুই বোন নারী নির্যাতনের নানা চিত্র খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁদের মা ও আশপাশের মানুষের জীবনের নির্যাতন তাঁদের জীবনেও নেমে আসুক, তাঁরা কোনোভাবেই তা হতে দিতে চান না। তাই বস্তির পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তনে নাটকে স্ত্রী, বোন ও ভাবিদের চরিত্রে অভিনয় করছেন সাহেরা। মুখাবয়বে একটা রাগী ভাব থাকায় প্রতিবাদী নারী চরিত্রে অভিনয় করছেন রোজিনা। মাঝেমধ্যে প্রতিবাদী পুরুষ চরিত্রেও নিজেকে মানিয়ে নেন তিনি। রোজিনা বলেন, ‘পরিবারের সবার ছোট হওয়ায় আমি খুব আদর পেয়েছি। একই কারণে আমি খুব রাগীও। তাই নাটকে প্রতিবাদী চরিত্রে অভিনয় করছি। এতে নিজের মধ্যে একটা শক্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। আমি এখন যেখানে যেতে চাই মা-বাবা মানা করেন না। ’

নাটকের মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে জানালেন ভাসানটেক বস্তির সিরাজুল ইসলাম সজিব। বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘বাবা প্রায় সময় মাকে মারধর করতেন। এতে আমার খুব খারাপ লাগত। একপর্যায়ে সখী চেঞ্জমেকার থিয়েটার গ্রুপের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমাকে নাটকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে রাজি হয়ে যাই। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক এসব নাটকে অভিনয় করার আগে বাবাকে নাটক দেখার অনুরোধ করি। একসময় বাবা তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। এর পর থেকে আমাদের বাসায় আর কোনো ঝগড়া-বিবাদ নেই। ’

সজিব বলেন, ‘আমার বাবা ছাড়াও বস্তির অনেকে নাটক দেখে স্ত্রীকে মারধর করা থেকে বিরত হয়েছে। বাল্যবিয়েও অনেকাংশে কমে গেছে। বস্তিতে বাস করে লেখাপড়া করেও যে অনেক বড় হওয়া যায় নাটকের মাধ্যমে আমরা তা তুলে ধরছি। এতে বস্তির শিশুদের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার হচ্ছে। এককথায়, শতভাগ না হলেও আমরা ভাসানটেক ও বাউনিয়াবাঁধ বস্তির ৯৫ ভাগ সামাজিক সমস্যা নিরসনে সক্ষম হয়েছি। ’

সখী প্রকল্পের আওতায় ভাসানটেক ও বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে পরিবেশিত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নাটক। এসব নাটকের যাবতীয় উপাদান বস্তির দৈনন্দিন পারিবারিক ঘটনা থেকে নেওয়া হয়। জীবনঘনিষ্ঠ ঘটনা দিয়ে নাটক তৈরির কারণে বস্তিবাসীর কাছেও তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

জানতে চাইলে ‘আমরাই পারি’-এর পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের জাতীয় সমন্বয়কারী জিনাত আর হক বলেন, ‘সাংস্কৃতিক কার্যক্রম দেখে মানুষ জীবনটা অনুধাবন করতে শেখে। এই শেখাটা পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে সাহায্য করে। এখানে যারা নাটক করছে তাদের নিজেদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন এসেছে তাদের পরিবারে, এমনকি পুরো বস্তির জীবনধারায়। এই উদ্যোগের এটাই বড় সার্থকতা। ’


মন্তব্য