kalerkantho


মুছে যাবে উদ্ভিদের জাদুঘর পরিচয়!

আপেল মাহমুদ   

২০ মে, ২০১৬ ০০:০০



মুছে যাবে উদ্ভিদের জাদুঘর পরিচয়!

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ওয়ারীতে বলধা গার্ডেনের এই জলাধারে থাকার কথা দুষ্প্রাপ্য বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের অবহেলায় তা পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

ঢাকায় গর্ব করার মতো যে কয়টি নিদর্শন রয়েছে, বলধা গার্ডেন সেগুলোর একটি। ১০৬ বছরের পুরনো এই বাগান দেশি-বিদেশি দুর্লভ অনেক বৃক্ষ-গুল্মের জন্য বিখ্যাত। বলধা এখনো অস্তিত্ব ধরে রেখেছে বটে, তবে পরিবেশ-দূষণে কাবু হয়ে পড়েছে; দিন দিন দুর্লভ গাছপালা, ফুল-অর্কিড হারিয়ে যাচ্ছে। আগের মতো বৃক্ষপ্রেমীদের আনাগোনা দেখা যায় না। এখন বখাটে, মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে এ বাগান।

স্থানীয়রা জানায়, একসময় ওয়ারীর এ উদ্যান নিয়ে তারা গর্ব করত। এখন ভুলেও কেউ ওই রাস্তা মাড়ায় না।

র‌্যাংকিন স্ট্রিটের বাসিন্দা আবুল খায়ের সালাহউদ্দিন বলেন, ‘উদ্যানের গেটে সবসময় বখাটেদের, মাদকসেবীদের ভিড় চোখে পড়ে। ১০ টাকার টিকিট কেটে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে, আপত্তিকর কাজ করে। সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের এ উদ্যানে অবস্থান করা সম্ভব নয়।’

বাগানের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘এখন আর ভদ্রলোকেরা আসেন না। যারা আসে তাদের বেশির ভাগ মাদক সেবন করতে বা অসামাজিক কাজ করতে আসে। কিছু অসৎ কর্মচারী তাদের নিরাপত্তা দেয়, এর জন্য তারা বকশিশ পায়। বকশিশ না দিলে অনেক সময় আপত্তিকর অবস্থায় আটক করে টাকা বা মোবাইল ফোন রেখে দেয় ওই কর্মচারীরা।’

বলধা গার্ডেনে প্রবেশের টিকিটের ঠিকাদার সুমি এন্টারপ্রাইজ। এর স্বত্বাধিকারী সিরাজুর রহমান সুমন বলেন, ‘বাগানটির তত্ত্বাবধান করে মিরপুরের ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন কর্তৃপক্ষ। আমি শুধু টিকিট বিক্রি করি। অন্য কোনো বিষয়ে বলার অধিকার আমার নেই। বাগানের পরিবেশ এবং গাছপালার দায়িত্ব বন বিভাগের।’

কলতাবাজারের আদি বাসিন্দা কবির ওস্তাগার বলেন, ‘সময় পেলেই আমরা দলবেঁধে বলধা গার্ডেনে যেতাম। দুর্লভ প্রজাতির গাছ-গাছালি মনকে প্রফুল্ল করে তুলত। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নিতাম। এখন ভুলেও যাই না। কিছুদিন আগে গিয়ে ভীষণ লজ্জায় পড়ি। পাশের বাড়ির কলেজ পড়ুয়া এক ছেলেকে সেখানে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ছুটে বেরিয়ে আসি।’

অব্যবস্থাপনার কারণে বলধা গার্ডেনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক দুষ্প্রাপ্য গাছ, অর্কিড, ফুলগাছ হারিয়ে গেছে। একসময় সেখানে আট শ প্রজাতির প্রায় ১৮ হাজার গাছ ছিল। সাইকি অংশের প্রধান আকর্ষণ ছিল নানা বর্ণের শাপলা, বিরল প্রজাতির দেশি-বিদেশি ক্যাকটাস, অর্কিড, অ্যানথুরিয়াম, ভূর্জপত্র, বকুল প্রভৃতি। অনেকগুলোই এখন নেই। মিসরীয় প্যাপিরাসের খুবই দুর্লভ একটি গাছ ছিল, এখন নেই।

বলধা গার্ডেন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, চারদিকে বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি। এসবের কারণে বাগানে রোদ পড়ে না বলেই চলে। স্থানীয়রা জানান, বাগানের গা-ঘেঁষে উঁচু ভবন গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে আরো উঁচু ভবন উঠবে। তখন বলধায় আলো-বাতাসই ঢুকবে না; গাছপালা, ফুল-অর্কিড সব মারা যাবে।

বাগানের ভেতরে বেশ কয়েক জায়গায় স্তূপ দেখা গেল। একজন কর্মচারী জানান, গাছের গোড়ায় দেওয়ার গোবর-সার আনা হয়েছিল, ওগুলো স্তূপাকারে পড়ে আছে। সার ও পানির অভাবে অনেক গাছ মারা যাচ্ছে। বলধা গার্ডেনকে শাস্তিমূলক পোস্টিংয়ের জায়গা গণ্য করা হয়, বন বিভাগের অনেক কর্মচারী কাজ না করে ঘুরেফিরে সময় পার করেন। এ অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদেরও।

বাগানের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল মান্নান সরকার বলেন, ‘চারদিকে হাইরাইজ ভবন ওঠার কারণে বাগানের জমি নিচু হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই কাদাপানিতে সয়লাব হয়ে যায়। পানি সহজে সরে না। সকালে সূর্যের আলোই পড়ে না। দীর্ঘক্ষণ ছায়া থাকায় অনেক দুর্লভ প্রজাতির গাছ-গাছালি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের কারণে যানবাহনের ধুলা-ময়লা সরাসরি এখানে এসে পড়ে। ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ দেখা দিয়েছে।’

নিসর্গবিদ মোকাররম হোসেন বলেন, ‘একসময় নিয়মিত বলধা গার্ডেনে যেতাম। সাইকি অংশের প্যাপিরাস গাছটি আমাকে টানত। এ প্রজাতির গাছ এ দেশে একটিই ছিল। কিছুদিন আগে সেখানে গিয়ে গাছটিকে দেখতে পাইনি। ভীষণ দুঃখ পেয়েছি। এর পর থেকে আর বলধায় যাই না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, ‘বলধা গার্ডেন দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষ-গুল্মের বাগান। দুর্লভ গাছ দেখানোর জন্য আমি সেখানে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গেছি।’ তিনি বলেন, ‘অব্যবস্থাপনার জন্য যদি কোনো গাছ মারা যায় তবে সেটা খুবই দুঃখজনক। অমূল্য গাছ-গাছালি, ক্যাকটাস, অর্কিড রক্ষার জন্য প্রয়োজনে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও বোটানির শিক্ষকদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা দরকার। গার্ডেন কর্তৃপক্ষ ডাকলে আমরা যাব। কিন্তু তারা কখনো ডাকেনি।’

একাধিক নিসর্গবিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বন বিভাগের হাতে বলধা নিরাপদ নয়। একে শুধু বাগান বা উদ্যান ভাবলে চলবে না। বলধা আসলে একটি উদ্ভিদ জাদুঘর। এর বিরল প্রজাতির গাছ, ফুল, অর্কিড হারিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না। ইতিমধ্যে অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতি হারিয়ে গেছে। রক্ষা করতে হলে অবশিষ্ট প্রজাতিগুলোর চারা বা কলম অন্য জায়গায় নিয়ে লাগাতে হবে। তাঁরা ঢাকার কাছে জমি খুঁজছেন; প্রয়োজনে দ্বিতীয় বলধা গার্ডেন গড়ে তুলবেন।

নিসর্গবিদ ফারুক আহমেদ বলেন, বলধার বয়স শত বছর ছাড়িয়েছে। গাছগুলোরও বয়স হয়েছে। এখন দরকার দুষ্প্রাপ্য গাছগুলোর রিপ্লেসমেন্ট। কিন্তু গার্ডেন কর্তৃপক্ষ সেটা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাজান লিলির জন্য একসময় বলধা বিখ্যাত ছিল। এখন এর জন্য তাদের মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিন-চার বছর আগে ঝড়ে একমাত্র রুদ্র পলাশ গাছটি মারা গেছে। দুষ্প্রাপ্য সুগারপাইন গাছটিও হারিয়ে গেছে। একমাত্র চন্দন গাছটিও অবহেলিত; যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

উল্লেখ্য, জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী ১৯০৯ সালে বলধা গার্ডেন গড়ে তোলেন অবকাশ যাপনের জন্য। তিন দশমিক ৩৮ একর আয়তনের বাগানে তিনি একটি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হতো। ১৯৫১ সালে এর দেখাশোনার ভার পড়ে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ওপর। পাকিস্তান সরকার ১৯৬২ সালে এর দায়িত্ব দেয় বন বিভাগকে। বর্তমানে এটি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি স্যাটেলাইট ইউনিট।

বলধা গার্ডেনকে নামমাত্র স্যাটেলাইট ইউনিট উল্লেখ করে একাধিক উদ্ভিদবিদ বলেন, এটি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। সঠিক পরিচর্যা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকারের ফলে বাগানটি ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছে। দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। আগামী এক যুগে এটি বিশেষায়িত উদ্যান আর থাকবে না।

বলধা গার্ডেনে প্রতিদিন হিন্দু ধর্মাবম্বীদের অনেকে যায় পূজা-সংক্রান্ত কাজে। তবে বখাটে আর মাদকসেবীর কারণে মহিলা পূজারিরা যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। পূজারি প্রকাশচন্দ্র সেন বলেন, ‘বলধা গার্ডেনে আমরা আসি শুধু পূজার উপকরণগুলো পুকুরে ভাসিয়ে দিতে। বখাটের উৎপাতে ঠিকমতো তা করা যায় না। পূজার ফুল আমরা বাইরে থেকে আনি, কিন্তু দর্শনার্থীরা দুর্লভ পদ্ম বা গোলাপ ফুল ছিঁড়ে প্রিয়জনকে উপহার দেয়; দেখার কেউ নেই।’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের ১০ জানুয়ারি বলধা গার্ডেন পরিদর্শন করেন। বাগানের অনেক বিদেশি ফুলের বাংলা নামকরণ করেন তিনি। কবি ক্যামেলিয়া ফুল দেখে এতটাই মোহিত হন যে বাগানে বসেই ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি লিখেন।



মন্তব্য