kalerkantho


চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

তিন কোটি টাকার মেশিন কেনা হলো ১০ কোটিতে!

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



তিন কোটি টাকার মেশিন কেনা হলো ১০ কোটিতে!

চীনের বাজডা কম্পানির এমআরআই মেশিনের (দশমিক ৩৫ তেসলা) আনুমানিক বাজারমূল্য তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা। কিন্তু চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে (সদর হাসপাতাল) সরকারিভাবে এ মেশিনটিই কেনা হয়েছে ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায়।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ওই হাসপাতালে আরো ৮-৯ কোটি টাকার বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম তদন্তে ইতিমধ্যে কমিটিও গঠন করা হয়েছে।  

সংশ্লিষ্টরা জানায়, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় গত ১০ এপ্রিল এমআরআই (ম্যাগনেটিক রিজোনেন্স ইমেজিং) মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়ম ও সরকারি কোষাগারে হাসপাতালের টাকা জমা না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক, বিএমএর সভাপতিসহ বিভিন্ন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে সভায় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ১৪ মে ব্যবস্থাপনা কমিটির পরবর্তী সভায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনকে।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক হাজার ৩১৩ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার রোগী ইনডোরে ভর্তি থাকে। এমআরআই মেশিন বিকলের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি এ হাসপাতালে গত দেড় বছর ধরে এ-সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

এখানে নতুন এমআরআই মেশিনের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হলেও সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়নি। এ হাসপাতাল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সরকারি টাকায় কেনা এমআরআই মেশিনটি গত বছরের ১০ জুন গ্রহণ করা হয়। ঢাকার বেঙ্গল সায়েন্টিফিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান মেশিনটি ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সরবরাহ করে। মেশিনটি পরিচালনার জন্য কোনো টেকনিশিয়ানও নেই। হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে টেকনিশিয়ান দিয়ে এটি চালানো হচ্ছে।

চট্টগ্রামের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে বিশেষজ্ঞ বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ বছর আগে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে জাপানের হিটাচি কম্পানির (দশমিক ৩ তেসলা) এমআরআই মেশিন বসানো হয়। একই মেশিন নগরের বেসরকারি একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও রয়েছে। এই মেশিনে প্রতিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এটি অনেক পুরনো মডেল। এরপর গত কয়েক বছরে নগরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অত্যাধুনিক এমআরআই মেশিন (৩ তেসলার) আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল অতিরিক্ত দামে নিম্নমানের এই এমআরআই মেশিন কিনেছে, যা দিয়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও সম্ভব হবে না।  

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুভাষ মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশ, ভারতসহ বেশ কিছু দেশ ঘুরেছি। প্রশিক্ষণসহ চিকিৎসা বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনারে অংশও নিয়েছি। কিন্তু কোথাও চীনের দশমিক ৩ তেসলার এমআরআই মেশিন চোখে পড়েনি। শুনেছি এবারই প্রথম এ রকম মেশিন সরকারি হাসপাতালে এসেছে। অথচ চিকিৎসা বিজ্ঞান যেভাবে এগিয়ে গেছে তাতে এখন অত্যাধুনিক এমআরআই মেশিনে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। ’

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও চিকিৎসক জানান, অনেকটা তড়িঘড়ি করে এমআরআই মেশিনটি কেনা হয়েছে। ওই সময় বাজারদর যাচাইয়ে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি অতিরিক্ত দামে মেশিনটি কিনতে অনাগ্রহ দেখালেও একপর্যায়ে তাঁরা বাধ্য হয়ে তাতে সই দেন। ১ দশমিক ৫ তেসলার এমআরআই মেশিন কিনতে পাঁচ-ছয় কোটি টাকা লাগে। কিন্তু দশমিক ৩৫ তেসলা মেশিন কিনতে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। জেনারেল হাসপাতালের ফ্লোরেও বড় আকৃতির তিনটি কার্টন রয়েছে। সেগুলোতেও ৮-৯ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জামাদি রয়েছে। কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি সেগুলো বুঝে নেয়নি।

এ বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি ও তদন্ত কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন না ধরায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান ও  চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুরশিদ আরা বেগমও ফোন ধরেননি।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও বিএমএ চট্টগ্রামের যুগ্ম সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো আমরা তদন্ত শুরু করিনি। আশা করছি তাড়াতাড়ি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কী অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে তা বলতে পারছি না। ’


মন্তব্য