kalerkantho

25th march banner

চলন্ত বাসে গণধর্ষণ

স্বীকারোক্তি হেলপারের চালকসহ দুজন রিমান্ডে

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



স্বীকারোক্তি হেলপারের চালকসহ দুজন রিমান্ডে

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে এক যাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগে চালকসহ তিন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো বিনিময় পরিবহনের ড্রাইভার হাবিবুর রহমান নয়ন (২৮), হেলপার আবদুল খালেক ভুট্টু (২৩) ও সুপারভাইজার রেজাউল করিম জুয়েল (৩৮)। গতকাল শনিবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে আবদুল খালেক ভুট্টু ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অন্য দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ওদিকে ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিলেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। গতকাল আদালত ধর্ষণের শিকার নারীর জবানবন্দিও রেকর্ড করেছেন। গত শুক্রবার ভোরে এ গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

ধনবাড়ী থানার ওসি মজিবর রহমান বলেন, অভিযুক্ত তিন শ্রমিককে শুক্রবার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। আলামত হিসেবে বাসটিও জব্দ করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এজাহারভুক্ত ৯ জন আসামির মধ্যে তিনজন বাসশ্রমিক ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অন্য ছয়জন সালিসের মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. রেহানা পারভীন বলেন, ধর্ষিতাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। শনিবার এ-সংক্রান্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি অনেকটাই সুস্থ। দুপুরের দিকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, গণধর্ষণের শিকার নারী (২৬) গার্মেন্টকর্মী হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছেন। তাঁর স্বামী পেশায় লেগুনাচালক। বর্তমানে সফিপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন এ দম্পতি। শুক্রবার ভোরে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থেকে সফিপুরের বাসায় ফেরার পথে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।

আক্রান্ত নারী বাস যাত্রীর বর্ণনা অনুসারে, বৃহস্পতিবার রাতে এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন তিনি। ভোররাতে ধনবাড়ী থেকে নিজ বাসায় ফেরার জন্য বাসস্ট্যান্ডে যান। ভোর ৫টার দিকে ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে বিনিময় পরিবহনের একটি বাস দাঁড়ানো ছিল। ১৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে তিনি বাসের তৃতীয় সারিতে গিয়ে বসেন। আর কোনো যাত্রী না নিয়েই বাসটি যাত্রা শুরু করে। চালকের সহকারী তাঁকে সামনের আসনে যেতে পীড়াপীড়ি করলেও তিনি রাজি হননি। তখন বাসের ওই স্টাফ পাশে বসে নিপীড়ন শুরু করে এবং টাকার বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে নারী ফোনকল করার চেষ্টা করেন বাসে লেখা শ্রমিক ইউনিয়নের নম্বরে। এ অবস্থায় বাসের স্টাফরা গামছা দিয়ে তাঁর মুখ ও ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে ফেলে। তারা টেনে নারী যাত্রীকে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। এরপর তিনজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে। তখন বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। মধুপুর বাসস্ট্যান্ডে বাস না থামিয়ে তারা বাঁ দিকে ময়মনসিংহ রোডে চলে যায়। কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়ি থামিয়ে নারীকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে তারা চলে যায়। নামিয়ে দেওয়ার আগেই তারা হুমকি দিয়েছিল ঘটনাটি কাউকে না জানাতে।

ধর্ষণের শিকার নারী হেঁটে মধুপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেন এবং অন্য বাসে চন্দরা গিয়ে স্বামীকে ঘটনা জানান।

স্বামী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘটনা জেনে টাঙ্গাইল শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে এক পরিবহন শ্রমিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দেখা করতে বলেন। নেতার বাসায় গেলে তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। স্ত্রীকে টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসাশেষে সন্ধ্যায় নতুন বাস টার্মিনালে গেলে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দেখা হয়। টার্মিনালে তখন ধর্ষকরাও উপস্থিত ছিল। ধর্ষণকারীদের তিনজনকে স্ত্রী চিহ্নিত করে দিলে নেতারা তাঁদের ডেকে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। ঘটনা মীমাংসার জন্য এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেন নেতারা। তা না মেনে দম্পতি রাতেই ধনবাড়ী থানায় পৌঁছে মামলা করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত বাসচালক হাবিবুর রহমান নয়নের বাড়ি কিসামত ধনবাড়ী গ্রামে। তার সহকারী আবদুল খালেক ভুট্টুর বাড়ি দয়ারামবাড়ী গ্রামে। আর সুপারভাইজার রেজাউল করিম জুয়েল নিজবর্ণি গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ রাতেই তাদের গ্রেপ্তারের পর শনিবার আদালতে উপস্থাপন করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) খান হাসান মোস্তফা পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন জানান। হেলপার আবদুল খালেক ভুট্টু ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্য দুজন আসামি নয়ন ও জুয়েলের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক লুনা ফেরদৌস। আদালত ২২ ধারায় ধর্ষিতার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

এদিকে টাঙ্গাইল জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মীর লুত্ফর রহমান লালজু বলেন, এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা পরিবহন সংগঠনের জন্য লজ্জাজনক। অভিযুক্ত তিনজনকে শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শনিবার সকালে জরুরি সভা আহ্বান করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক লাখ টাকায় সমঝোতার অভিযোগটি সঠিক নয়। শ্রমিক নেতারা নয় অন্য কারো সঙ্গে অভিযোগকারীদের কথা হতে পারে।


মন্তব্য