kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

মা-বাবার অবর্তমানে অটিস্টিক শিশুর দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



মা-বাবার অবর্তমানে অটিস্টিক শিশুর দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র

নবম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অটিজম শিশুদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

মা-বাবার অবর্তমানে রাষ্ট্রই অটিস্টিক শিশুদের লালনপালনের ব্যবস্থা করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় একটি করে অটিজম চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০১৬ উপলক্ষে গতকাল শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

পৃথিবীর বিখ্যাত কয়েকজন বিজ্ঞানী এবং মনীষী জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী থাকার পরও স্বীয় প্রতিভাগুণে বিশ্ববরেণ্য হতে পেরেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবন্ধীরা কোনো না কোনো বিষয়ে বিশেষ মেধাসম্পন্ন হয়। আমরা যদি প্রতিবন্ধীদের মেধা বিকাশের সুযোগ দিই, তাহলে তারা সমাজকে অনেক কিছু দিতে পারে। আমরা এখন সে চেষ্টা করব। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সব সময় উপলব্ধি করি যে অটিস্টিক শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে মায়ের। তাই তাদের মা-বাবা যখন থাকবে না, তখন এদের কী হবে? এরা কোথায় যাবে? আমরা এ ব্যাপারে একটা উদ্যোগ নিচ্ছি। মা-বাবা যখন থাকবে না, তখন সরকারের পক্ষ থেকে তাদের লালনপালনের ব্যবস্থা আমরা করব। ’

ছিয়ানব্বই-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে চালু করা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বিএনপি-জামায়াত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ

করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্ট করে এমনভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তিত হলেও কেউ তা বন্ধ করতে না পারে। ’ তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও যেন প্রযুক্তির উত্কর্ষের সব সুবিধা গ্রহণ করতে পারে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও ওয়েবসাইট তৈরিতে এগিয়ে আসার জন্যও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, অটিজমসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রকাশেরও অধিকার আছে। তাদের সে সুযোগ দিতে হবে।

প্রতি জেলা-উপজেলায় একটি করে অটিজম চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনে সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। ৬৪ জেলায় এবং ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ২০ লাখ প্রতিবন্ধী সেবা গ্রহণ করছে। ঢাকায় শিশু হাসপাতালসহ ১৫টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করে অটিজম সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসাসুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায়ও একটি করে অটিজম শনাক্তকরণ কেন্দ্র করা এবং তাদের কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। ’ তিনি বলেন, যাঁরা সেবা প্রদান করবেন তাঁদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে, যেমন—সেনানিবাসে ‘প্রয়াস’ নামে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ প্রতিটি সেনানিবাসে আমি এরই মধ্যে নির্দেশ দিয়েছি আমাদের প্রতিটি সেনানিবাসে এই প্রয়াসের শাখা তৈরি করা হবে। ’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী মো. বাবুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন এমপি। এ ছাড়া জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসরিন আরা সুরাত আমিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অটিজম ও স্নায়বিক সমস্যাজনিত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন জাতিসংঘে অটিজমবিষয়ক মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকায় অনুষ্ঠানে তাঁর ধারণ করা বক্তব্য শোনানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি শিশুদের আঁকা ছবিসংবলিত শুভেচ্ছা কার্ড বিভিন্ন উৎসবের সময় ব্যবহার করে থাকেন। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল প্রতিবন্ধী বা অটিস্টিক বাচ্চাদের মা-বাবাকে অনেক সময় মানুষের কাছে হেয় হতে হতো। অটিস্টিক বাচ্চাকে লুকিয়ে রাখা হতো। এ জন্য মাকে দোষ দেওয়া হতো। আসলে অটিস্টিক হয়ে জন্মানোর পেছনে মা-বাবার কারো কোনো হাত নেই। এখন এ ধারণাটা বদলেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আর প্রতিবন্ধিতার জন্য মা-বাবাকে দোষারোপ করার সেই সুযোগটা নেই। থাকাও উচিত নয়। সবারই মনটা এখন বড় করা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তারা যদি আমাদের সমাজকে কিছু দিতে পারে, সেটা আমরা নেব। অটিজম বিষয়ে সচেতনটা সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী সবাকে ধন্যবাদ জানান।

শেখ হাসিনা তাঁর মেয়ে ও সমাজকর্মী সায়মা ওয়াজেদের কাছ থেকেই অটিজম বিষয়ে শিক্ষা পেয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, সমাজবিজ্ঞানে লেখাপড়া করা সায়মার আগে থেকেই এসব বিষয়ের প্রতি গভীর টান ছিল। প্রধানমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রে সায়মার কর্ম প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাঁরা কিভাবে কাজ করেন, তা তিনি দেখে এসেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘে প্রথম যে রেজল্যুশন হয়েছে, সায়মাই সেই উদ্যোগ নিয়েছে। জাতিসংঘ রেজল্যুশনগুলো নেওয়ায় সারা বিশ্বে এটি সাড়া ফেলেছে। সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। কাজেই আজকে আর অটিস্টিক শিশুরা অবহেলায় থাকবে না। তাদের জন্য আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে দেব।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের মূল ধারায় আনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাডেমি ফর নিউরো ডিজর্ডার নামে একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিমধ্যেই জায়গা আমি দিয়ে দিয়েছি এবং এটি যেন খুব তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা হয় সেই পদক্ষেপও আমরা নিচ্ছি। এখানে অটিস্টিকসহ সব প্রতিবন্ধী মানুষের একযোগে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। ’

ব্যক্তিগত খাতেও প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। তারা কাজ করে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তাদের যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, সরকার সে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে শোনানো বক্তব্যে সায়মা ওয়াজেদ সমাজে না জেনেই কাউকে যেন অটিস্টিক হিসেবে চিহ্নিত না করা হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন। প্রতিবন্ধীদের সমাজেরই একজন বিবেচনা করে তাদের মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্যও তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী নীল আলো জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধী দিবসের কার্যক্রম উদ্বোধনের পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের পরিবেশনায় ‘আলোর ভুবন’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে গিয়ে তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। সূত্র : বাসস।


মন্তব্য