kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে প্লট বরাদ্দ বাতিল

ফারজানা লাবনী   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে প্লট বরাদ্দ বাতিল

সাভারে চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট পাওয়া কোনো ট্যানারি ১৫ এপ্রিলের মধ্যে উৎপাদনে যেতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওই প্লট বরাদ্দ বাতিল করা হবে। আর রাজধানীর হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ বন্ধে চলমান নজরদারিও অব্যাহত থাকবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কথা শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চামড়া ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারি সরিয়ে নিতে বাধ্য করতে গত ১ এপ্রিল থেকে হাজারীবাগের ট্যানারিপল্লীতে কাঁচা চামড়া নিয়ে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। শিল্প মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকায় পুলিশ পাহারার মধ্যেই গতকাল শনিবার নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হয়। এদিন হাজারীবাগে বাইরে থেকে কোনো কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেনি। আর ট্যানারিগুলো নতুন কাঁচা চামড়া সংগ্রহ না করে গুদামে থাকা চামড়া দিয়েই কাজ চালিয়েছে।

হাজারীবাগের একাধিক ট্যানারিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া বিক্রির জন্য হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে যোগাযোগ করেছেন চামড়া বিক্রেতারা। তবে ট্যানারির মালিকরা তাঁদের জানিয়ে দিচ্ছেন, এখন হাজারীবাগে নতুন করে কাঁচা চামড়া কেনা হবে না।

বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার আমাদের জুন পর্যন্ত সময় না দিলে হাজারীবাগের ট্যানারি সাভারে চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে না। এই দুই মাস কোনো চামড়া কিনতে দেওয়া না হলে আমরা কিনব না। সে ক্ষেত্রে গুদামে থাকা যে সামান্য কিছু চামড়া আছে তা দিয়েই কাজ চালানোর চেষ্টা করব। ’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের কারণে দেশের চামড়াশিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে। ’

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ট্যানারি স্থানান্তর ইস্যুতে চামড়াশিল্পে এক ধরনের অচলাবস্থা নেমে এসেছে—মন্ত্রণালয় সূত্র এমন তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে। একই সঙ্গে সূত্র জানায়, এই অচলাবস্থা নিরসনে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সঙ্গে বৈঠকে বসতে চাচ্ছেন চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা। বৈঠকে তাঁরা হাজারীবাগে স্বল্প পরিসরে হলেও চামড়া প্রবেশের আবেদন জানাবেন। একই সঙ্গে তাঁরা মন্ত্রীকে অবহিত করবেন, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট পাওয়া ট্যানারির মালিকরা শিল্প স্থানান্তরে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই স্থানান্তরের কাজ চলতি এপ্রিলের মধ্যেই ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতিও মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরবেন ট্যানারি মালিকরা।

তবে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় যেতে রাজি নন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এ বিষয়ে নতুন করে আর কোনো আলোচনা নয়। মন্ত্রী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্যানারি সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে সরিয়ে নিতে মালিকদের বহুবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের কথামতো বারবার সময় বাড়ানো হয়েছে। অথচ কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাই সরকার এখন যে পদক্ষেপ নিয়েছে তার নড়চড় হবে না। ’ একই সঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আশা করছি সব প্রস্তুতি শেষে চলতি মাসের মধ্যেই হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। ’

শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘ন্যূনতম ৩০টি ট্যানারি টানা দুই মাস উৎপাদনে গেলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্বাভাবিকভাবে চালু হবে। এত অর্থ ব্যয় করে সিইটিপি স্থাপন করে শুধু ট্যানারির বর্জ্যের অভাবে তা নষ্ট করে ফেলা যাবে না। সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আর স্থানান্তরে ব্যর্থতার দায়ে বাতিল করা প্লট নতুন করে বরাদ্দ নেওয়ার মতো চামড়া ব্যবসায়ীরও অভাব হবে না। ’

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক দেশি-বিদেশি চামড়া ব্যবসায়ী সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট পাওয়ার আবেদন করেছেন। এসব আবেদনে কোনো ট্যানারির মালিকানা বাতিল করা হলে সেই প্লটপ্রাপ্তির বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় সব সময় চায় প্লটপ্রাপ্ত ট্যানারি মালিকরাই এখানে শিল্প স্থানান্তর করে ব্যবসা করুক। আমরা তাদের ক্ষতিপূরণের কয়েক কিস্তির অর্থও দিয়েছি। কোনো ট্যানারির মালিক বর্তমান পরিস্থিতিতেও অজুহাত দেখালে মন্ত্রণালয় নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। তবে সবই হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। পরিবেশের বিষয়টি আমরা সবচেয়ে আগে বিবেচনা করব। ’

আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে বিদ্যমান সব বাধা এত দিনে দূর হয়েছে। এখানকার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের চারটি মডিউলের দুটি ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। এখন ট্যানারির কঠিন বর্জ্য পেয়ে তা পূর্ণোদ্যমে চলমান রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ’

জানা গেছে, হাজারীবাগের প্রতিটি ট্যানারি সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট পেয়েছে। এসব ট্যানারির বর্জ্যে বুড়িগঙ্গার পানিসহ চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক হুমকির মুখে। মালিকদের বারবার নোটিশ এবং সতর্ক করার পরও নানা অজুহাত দেখিয়ে তাঁরা হাজারীবাগ থেকে কারখানা সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে নিচ্ছেন না। এ অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তর না করলে কেবল শিল্প প্লট বাতিল নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও বিবেচনাধীন।


মন্তব্য