kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


নাবিক নিয়োগের আড়ালে চলছে মানবপাচার!

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



নাবিক নিয়োগের আড়ালে চলছে মানবপাচার!

জাহাজে নাবিক নিয়োগের নামে চলছে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচার। নিরীহ নাবিকদের নিয়ে ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ চললেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে নাবিক নিয়োগকারী সংস্থাগুলো (মেনিং এজেন্ট)।

এসব দুর্নীতিবাজ এজেন্টের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে অভিযোগের ‘পাহাড়’ জমলেও অজ্ঞাত কারণে পার পেয়ে যায় সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগী নাবিকদের অভিযোগ, অধিদপ্তরের কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে বারবার অনিয়ম-দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন মেনিং এজেন্ট মালিকরা।

এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেননি বাংলাদেশ মেনিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নেতারা। বাংলাদেশ মেনিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনোয়ারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশের সব মেনিং এজেন্টের দুর্নাম হচ্ছে। সরকার চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। অসাধু মেনিং এজেন্টরা মানব পাচার করায় বিভিন্ন দেশে এখন বাংলাদেশি নাবিকরা যেতে পারছেন না। এতে নাবিকদের চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ’

জানা গেছে, সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিক নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ৯৬টি বেসরকারি সংস্থাকে ‘মেনিং এজেন্ট’ লাইসেন্স দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। বর্তমানে ৬৩টি মেনিং এজেন্ট  রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কয়েকটির বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। অভিযোগ প্রমাণের পর সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর তাদের লাইসেন্স স্থগিত করে। কিন্তু এক মাস না যেতেই রহস্যজনক কারণে প্রত্যাহার করা হয় স্থগিতাদেশ।

সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নথিপত্র থেকে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এম জাকিউর রহমান ভূঁইয়া বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে মেসার্স এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেসের লাইসেন্সের কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত করেন (স্মারক নং-৪০১.০০৬.০৫৯.০০.০০.২০৫/এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেস/৪৬৬৩ (৭)। এ আদেশ জারির তিন মাসের মধ্যে ছয়টি শর্ত আরোপ করে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। একইভাবে গত বছর ১৬ নভেম্বর আবার মেসার্স এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেসের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। মাত্র ৩৫ দিনের ব্যবধানে সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেসের স্বত্বাধিকারী আব্বাস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও বেশি। গত কয়েক বছরে হাজারো নাবিককে জাহাজে নিয়োগ দিয়েছি। তাই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা স্বাভাবিক। ’

বেনিনে অবৈধভাবে লোক পাঠানোর অভিযোগ, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের শর্ত পূরণ না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মেসার্স কে এস এফ শিপিং সার্ভিসেস নামের মেনিং এজেন্টের লাইসেন্স ২০১০ সালের ১০ মে তিন মাসের জন্য বাতিল করে অধিদপ্তর। একই বছর ডিসেম্বর মাসে ওই প্রতিষ্ঠান ১৭ জন নাবিককে সৌদি আরব পাঠায়। কিন্তু ওই নাবিকরা জেদ্দার হোটেল থেকে পালিয়ে যান। এরপর থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

এ ঘটনার পর সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর মেসার্স কেএসএফ শিপিং সার্ভিসেসের লাইসেন্স স্থগিত করে। মানবপাচারের মতো অপরাধ করার পরও মাত্র চার মাসের ব্যবধানে (১৯-০৪-২০১১) অজ্ঞাত কারণে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার যোগসাজশে এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরে ২০১২ সালের ৩০ জানুয়ারি আবারও মেসার্স কেএসএফ শিপিং সার্ভিসেসের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। একইভাবে দুই মাসের মধ্যে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারি মেরিন একাডেমির ক্যাডেট ধীমান বড়ুয়া (সিডিসি নং সি/ও/৮১৪৯) শিপিং অফিসে অভিযোগ করেন, মেসার্স মেরিন (এজেন্সি) সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাঁকে জাহাজে নিয়োগের জন্য সাইন-অন করিয়ে গত দুই মাস বসিয়ে রেখেছে। এ বিষয়ে শিপিং মাস্টার ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। ওই ঘটনার পর ধীমান বড়ুয়ার সাইন-অন বাতিলের জন্য মেসার্স মেরিন (এজেন্সি) সার্ভিসেসের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয় শিপিং অফিসে।

শিপিং সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেনিং এজেন্টরা তাদের নিজস্ব মেরিন একাডেমির ক্যাডেটদের জাহাজে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারি মেরিন একাডেমির ক্যাডেটদের সাইন-অন করায়। কিন্তু পরে আর তাঁদের জাহাজে চাকরি দেওয়া হয় না।

জাহাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর নিয়ম করে দিয়েছে, একজন বেসরকারি মেরিন একাডেমির কিংবা ডাইরেক্ট এন্ট্রির একজন ক্যাডেটকে চাকরি দিতে হলে সরকারি মেরিন একাডেমির দুজন ক্যাডেটকে (২ঃ১ পদ্ধতিতে) নিয়োগ দিতে হবে। এই নিয়ম ফাঁকি দেওয়ার জন্য মেনিং এজেন্টরা সরকারি মেরিন একাডেমির ক্যাডেটদের শুধু সাইন-অন করিয়ে রাখে। তাঁদের জাহাজে নিয়োগের ব্যবস্থা করে না।

এ বিষয়ে ক্যাপ্টেন আনোয়ারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার কারণে এসব অসাধু মেনিং এজেন্ট বারবার অপরাধ, অনিয়ম, দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যায়। এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অনিয়ম অনেকটা দূর হবে।


মন্তব্য